
নয়া দিল্লি: দেশের সবথেকে বড় উদ্যোগপতিদের নাম নিলে প্রথমেই আসবে রতন টাটা (Ratan Tata)-র নাম। তাঁর নামই যথেষ্ট পরিচয়ের জন্য। টাটা গ্রুপকে শুধু দেশের অন্দরে নয়, বিশ্বের দরবারেও পরিচিত করেছিলেন রতন টাটা। তাঁর অবর্তমানে টাটা সন্সের দায়িত্ব ছিল এন চন্দ্রশেখরনের (N Chandrasekharan) কাঁধে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি টাটা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিলেন এন চন্দ্রশেখরন। তাঁর ইস্তফার পরই প্রশ্ন উঠেছে, এবার টাটা সন্সের দায়িত্ব কে নেবেন?
টাটা গ্রুপ-এর নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন হতে চলেছে। বুধবার টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন এন চন্দ্রশেখরন। টাটা গ্রুপের অন্দরে ‘চন্দ্র’ নামে পরিচিত চন্দ্রশেখরন প্রায় এক দশক ধরে এই দায়িত্ব সামলানোর পর এবার সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাঁর পদত্যাগপত্রে কেন তিনি আর একটি মেয়াদের জন্য দায়িত্বে থাকছেন না, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন চন্দ্রশেখরন। তবে তাঁর বিদায়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, টাটা সন্সের পরবর্তী চেয়ারম্যান কে হবেন?
এই নিয়ে জোর জল্পনার মধ্যেই ফরচুন (Fortune)-এর একটি প্রতিবেদনে সম্ভাব্য উত্তরসূরী হিসাবে উঠে এসেছে নোয়েল টাটার নাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (RBI) যদি শেষ পর্যন্ত টাটা সন্সকে আইপিও (IPO)-র মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে জোর দেয়, তাহলে নোয়েল টাটা সংস্থার অর্থাৎ টাটা সন্সের বোর্ড পুনর্গঠন করতে পারেন এবং নিজে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে পারেন। ১৭০ বিলিয়ন ডলারের টাটা গোষ্ঠীর উপর প্রভাব বজায় থাকবে টাটা পরিবারেরই।
নোয়েল টাটা বর্তমানে টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। টাটা ট্রাস্টের হাতে টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিচালন কাঠামো এবং ডিরেক্টরদের মনোনয়নের মতো বিষয়গুলির ক্ষেত্রে টাটা সন্সের উপর ট্রাস্টের প্রভাব সরাসরি নয়। নোয়েল টাটা এবং বেণু শ্রীনিবাসন বর্তমানে টাটা ট্রাস্টের মনোনীত সদস্য হিসেবে টাটা সন্সের বোর্ডে রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁদের ভেটো ক্ষমতাও রয়েছে।
টাটা সন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অংশীদার হবেন। এর ফলে সংস্থার উপর বাড়বে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং নিয়ন্ত্রক নজরদারি। এতে টাটা ট্রাস্ট এবং টাটা পরিবারের হাতে থাকা প্রভাব কিছুটা দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে নোয়েল টাটা টাটা সন্সের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, হোল্ডিং সংস্থাটি বেসরকারি থাকলে, টাটা ট্রাস্ট দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং মূলধন বণ্টনের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব বজায় রাখতে পারবে। একইসঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর মালিকানার সঙ্গে যুক্ত জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যগুলিও বজায় রাখা সম্ভব হবে।
পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাটা পরিবারের আশঙ্কা—টাটা সন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে ধীরে ধীরে সংস্থাটি টাটা ট্রাস্টের থেকে আরও স্বাধীন হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ট্রাস্টের হাতে বড় অংশীদারি থাকার পরেও এই পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে টাটা পরিবারের প্রভাবও ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে টাটা সন্সের বোর্ডের গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যদি টাটা সন্সকে শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতেই হয়, তাহলে নোয়েল টাটা বোর্ডে টাটা ট্রাস্টের আরও শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব দাবি করতে পারেন বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। তাঁর উদ্দেশ্য হবে, সংস্থার প্রতিদিনের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং শেয়ারবাজারের নিয়মের আওতায় চলে আসার পরও কৌশলগত সিদ্ধান্তে টাটা পরিবারের প্রভাব বজায় রাখা।
চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগের সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১৮ অগস্ট রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারহোল্ডারদের বৈঠক। চন্দ্রশেখরন ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, তিনি আর পুনর্নিয়োগের জন্য নিজের নাম প্রস্তাব করবেন না।
এদিকে, টাটা গোষ্ঠীর অন্দরের জল্পনা, চন্দ্রশেখরন এবং নোয়েল টাটার মধ্যে নতুন ব্যবসাগুলির পারফরম্যান্স এবং মূলধন বণ্টন নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে এয়ার ইন্ডিয়া (Air India), টাটা ডিজিটাল (Tata Digital) এবং টাটা ইলেকট্রনিক্স (Tata Electronics)-এর মতো নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ ও লোকসান নিয়ে নোয়েল টাটা সংস্থার চেয়ারম্যানের কাছে আরও স্পষ্ট বার্তা চেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
জল্পনা রয়েছে, লোকসানে থাকা ব্যবসাগুলির জন্য টাটা সন্সকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হতে পারে। আর তার ফলে সংস্থাটি আপার লেয়ার এনবিএফসি (Upper-Layer NBFC) হিসাবে আরবিআই (RBI)-এর নিয়মের আওতায় পড়তে পারে। ফলে টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ কাঠামো, সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি এবং গোষ্ঠীর নেতৃত্ব-এই তিনটি বিষয়ই এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।