
গোয়ালিয়র: হোয়াটসঅ্যাপে (WhatsApp) একটা ছোট মেসেজ। ‘হ্যাঁলো, দিস ইজ দিব্যা স্পিকিং'(Hello… this is Divya speaking)। শুরুটা হয়েছিল এভাবেই। ভাবছেন কোনও রোম্যান্টিক গল্পের কথা বলছি? একেবারেই না। গল্প তো বটেই, তবে, দেশের মধ্যে অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurruncy) প্রতারণার গল্প। প্রতারণার শিকার হয়েছেন মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের ৭০ বছরের প্রবীণ। জানলে আরও অবাক হবেন তিনি নিজে একজন চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। মধ্যপ্রদেশ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ রিটার্নিং অফিসারও। নাম অশোক বিজয়বর্গীয়। অভিযোগ, একটা মেসেজেই তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও ২১ কোটির বেশি। ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই হইচই পড়ে গিয়েছে সর্বত্র।
অশোক বিজয়বর্গীয়র অভিযোগ, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি মোবাইল নম্বর থেকে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ আসে। নিজেকে ‘দিব্যা’
বলে পরিচয় দেন। জানান, তিনি একজন বিনিয়োগ পরমার্শদাতা বা ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজ়ার। দাবি করা হয়, USDT(Tether)-তে বিনিয়োগ করলে অল্প সময়েই বিপুল লাভ হবে।
প্রথমে তাঁকে একটি অনলাইন ট্রেডিং পোর্টালের লিঙ্ক পাঠানো হয়। সেখানে অ্যাকাউন্ট খুলে USDT, বিটকয়েন-সহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করতে বলা হয়। শুরুতে অল্প অঙ্কের বিনিয়োগ করানো হয়।
২৫ ডিসেম্বর তিনি চারবারে ১০ হাজার টাকা করে UPI-র মাধ্যমে পাঠান। পরে এক বন্ধুর UPI অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রায় ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেন। পোর্টালে লাভও দেখানো হচ্ছিল।
৭ জানুয়ারি প্রতারকরা তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১.৮৮ লক্ষ টাকা ফেরত পাঠায়। শুধু স্ক্রিনে লাভ দেখানো হয়নি। বাস্তবেই টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে। এতে তিনি নিশ্চিত হন যে প্ল্যাটফর্মটি আসল। ভুয়ো নয়। এরপর ৩১ ডিসেম্বর তিনি অন্য একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে ১৫ লক্ষ টাকা RTGS-এর মাধ্যমে পাঠান। পরবর্তী কয়েক মাসে ধাপে ধাপে কোটি কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন।
ক্রমাগত বিনিয়োগের পর ভুয়ো ট্রেডিং পোর্টালে তাঁর অ্যাকাউন্টে ৩৩.২৫ কোটি টাকার লাভ দেখানো হয় বলে অভিযোগ। কিন্তু সেই টাকা তুলতে গেলে জানানো হয়, আগে ১০.৮৪ কোটি টাকা আয়কর হিসেবে জমা দিতে হবে। পরে আবার ১ কোটি টাকা ‘রিস্ক মার্জিন’ দেওয়ার দাবি করা হয়। প্রতারকরা এমনও দাবি করে যে তারা নিজেরাই ৫.৩৪ কোটি টাকা দেবে, বাকি টাকা তাঁকেই জোগাড় করতে হবে।একের পর এক টাকা দেওয়ার পরও কোনও অর্থ ফেরত না পেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন অশোক বিজয়বর্গীয়। সাইবার সেলে অভিযোগ করেন।
সাইবার সেলের তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
প্রথম ধাপে টাকা যায় ৭৭টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
সেখান থেকে ৪৯৩টি দ্বিতীয় স্তরের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।
এরপর প্রায় ১২,৭০০টি তৃতীয় স্তরের অ্যাকাউন্টে টাকা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
চতুর্থ স্তরে আরও ৭,৫০০টি লেনদেনের মাধ্যমে টাকা ATM থেকে তোলা, শপিং ভাউচার, ক্যাশ ভাউচার, অনলাইন পেমেন্ট এবং USDT-সহ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হয়।
তদন্তে জানা গিয়েছে, এই প্রতারণার টাকা কর্নাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ, কেরলম,হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, মধ্য
প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তীসগঢ়-সহ একাধিক রাজ্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঘোরানো হয়েছে।
গোয়ালিয়র স্টেট সাইবার সেলের ডিএসপি সঞ্জীব নয়ন শর্মা জানিয়েছেন, ৭৭টি প্রথম স্তরের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ২ কোটি টাকা ফ্রিজ করা সম্ভব হয়েছে।
তদন্তকারীরা তিনটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর,একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং ভুয়ো ট্রেডিং ওয়েবসাইটের URL খতিয়ে দেখছেন। বিশেষ করে নম্বরটি আদৌ আমেরিকা থেকে পরিচালিত হয়েছিল কি না, নাকি ভার্চুয়াল নম্বর ছিল, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে।
অজ্ঞাতপরিচয় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ৩১৮(৪) ও ৩১৯(২) ধারা এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ডি ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের হয়েছে। অভিযোগটি ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল এবং ১৯৩০ সাইবার হেল্পলাইনে নথিভুক্ত করা হয়েছে।