
লতা মঙ্গেশকর (Lata Mangeshkar) কিংবা মহম্মদ রফি (Mohammed Rafi)—আজও আমাদের কাছে গানের জগতের সবচেয়ে বড় নাম। কিন্তু ইতিহাসের পাতা একটু উল্টে দেখলেই উঠে আসে এমন এক গায়িকার নাম, যিনি এই দুই নামী তারকা আসার বহু আগেই ভারতের গানের জগতে ইতিহাস গড়েছিলেন। বলিউডের জন্ম হওয়ার বহু আগেই তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম ‘কোটিপতি’ গায়িকা! প্রচুর টাকা, নাম আর রাজকীয় চালচলন, সবই ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়। অথচ জীবনের শেষ পরিণতি যে এমন কষ্টের হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
গল্পের শুরুটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। ১৮৭৩ সালে এক আর্মেনীয় পরিবারে জন্ম হয় এই গায়িকার। তখন তাঁর নাম ছিল অ্যাঞ্জেলা ইয়োওয়ার্ড। মাত্র ৬ বছর বয়সে মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে, যা ছোট অ্যাঞ্জেলার পুরো জীবনটাই বদলে দেয়। পরবর্তীতে তাঁর মা এক মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং অ্যাঞ্জেলার নতুন নাম হয় গওহর জান। ১৮৮৩ সালে মা ও মেয়ে কলকাতায় চলে আসেন। শুরু হয় গান শেখা। রূপ আর সুরের এমন মেলবন্ধন তৈরি হয় যে, মাত্র ১৫ বছর বয়সেই রাজ দরবারে প্রথম গান গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন গওহর।
গওহর জান
এর পরেই শুরু হয় এক জাদুকরী অধ্যায়। বিংশ শতাব্দীর ঠিক শুরুতে, ১৯০২ সালে ভারতে যখন প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড করার প্রযুক্তি এল, তখন রেকর্ড কোম্পানির কর্তারা প্রথম গান রেকর্ড করার জন্য সোজা চলে যান গওহরের বাড়ি। সেই আমলে রেকর্ড কোম্পানির থেকে একটা গান রেকর্ড করার জন্য তিনি ফি নিতেন ১,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা! তখনকার দিনে এই টাকার অঙ্কটা যে কত বড় ছিল, তা একটা সাধারণ হিসাব দেখলেই বোঝা যাবে। এর প্রায় ৫০ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৫০-এর দশকে লতা মঙ্গেশকর কিংবা মহম্মদ রফির মতো নামী গায়করাও প্রতি গানের জন্য পেতেন ৫০০ টাকার কাছাকাছি! অর্থাৎ লতা-রফিদের যুগের কত আগে দাঁড়িয়ে তিনি কতটা উঁচুতে ছিলেন, তা সহজেই বোঝা যায়।
প্রচুর টাকার সঙ্গে গওহরের জীবনযাত্রাও হয়ে উঠেছিল একদম রানিদের মতো। তিনি চারটে ঘোড়ায় টানা এক বিশেষ গাড়িতে চেপে শহরের বুক চিরে ঘুরে বেড়াতেন। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে ওই বিশেষ ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার অধিকার ছিল শুধু দেশের ভাইসরয়ের! নিয়ম ভাঙার জন্য পুলিশ তাঁকে বারবার মোটা অঙ্কের জরিমানা করত। কিন্তু গওহরও নিজের মেজাজে অনড় ছিলেন। প্রতিবার হাসিমুখে জরিমানা মিটিয়ে নিজের রাজকীয় গাড়িতেই ঘুরে বেড়াতেন। ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে বিলাতের রাজা পঞ্চম জর্জের সামনে গান গাওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি।
তবে জীবনের শেষ অধ্যায়টা হয় বড্ড কষ্টের। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একাকীত্ব আর মানসিক কষ্ট তাঁকে ঘিরে ধরে। শেষ বয়সে মহীশূরের রাজপ্রাসাদে দরবারি গায়িকা হিসেবে যোগ দিলেও, ১৯৩০ সালে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে বড্ড অনাদরে মারা যান তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর অঢেল সম্পত্তির লোভে অনেকেই ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু আদালতের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, জীবনের শেষ কয়েক বছরে ভুল মানুষের ওপর বিশ্বাস আর ঋণের জালে জড়িয়ে নিজের সব সম্পদ তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। দেশের প্রথম কোটিপতি গায়িকা, যার সুরের ছন্দে একসময় মাতোয়ারা হয়ে থাকত সকলে, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়।