
লাল পিঁপড়ের কামড় খেলে ব্যথায় কার্যত ককিয়ে উঠতে হয়। কামড়ের চোটে জায়গাটা ফুলেও ঢোল হয়ে যায় কখনও কখনও। এই পতঙ্গটিকে কে না দূরে রাখতে পছন্দ করে বলুন তো! কিন্তু এই পিঁপড়ে আর তার ডিম যদি শিলনোড়ায় বেটে আপনার পাতে দেওয়া হয়? প্রথমটায় হয়তো অনেকেই নাক সিঁটকোবেন। তবে একবার জিভে ঠেকালে নাকি তার স্বাদ ভোলা দায়! অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ওড়িশার আদিবাসী এলাকায় লাল পিঁপড়ের চাটনি বা ‘কাই চাটনি’ এক দারুণ জনপ্রিয় খাবার। শুধু কি স্বাদ? পুষ্টিগুণেও এটি সুপারহিট। ২০২৪ সালের শুরুতেই দেশের সরকারি নথিতে এই অভিনব পদটি পেয়েছে সম্মানজনক জিআই (GI) ট্যাগ। কিন্তু পিঁপড়ের ডিম বা চাটনি খাওয়া কি শরীরের জন্য সত্যিই ভালো? আসুন, জেনে নিই বিজ্ঞানের আসল সত্যিটা।
জিআই ট্যাগের স্বীকৃতি
ওড়িশার শিমিলিপাল অরণ্য এবং সংলগ্ন ময়ূরভঞ্জ ও কেওনঝড় জেলার আদিবাসী সম্প্রদায়ের রোজকার জীবনের অঙ্গ এই লাল পিঁপড়ে। ২০২০ সালে এই খাবারের জিআই ট্যাগের জন্য আবেদন করেছিল ময়ূরভঞ্জ কাই সোসাইটি। অবশেষে দীর্ঘ গবেষণার পর, ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি সরকারিভাবে ‘সিমিলিপাল কাই চাটনি’-কে জিআই ট্যাগ দেওয়া হল। স্বীকৃতিপত্রে এই খাবারের অবাক করা পুষ্টিগুণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুষ্টির অজানা খনি
গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, এই লাল পিঁপড়ে ও তার ডিমে রয়েছে অন্তত ২০ রকমের প্রোটিন। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ডি, ই। আরও মিলবে ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম ও সোডিয়ামের মতো জরুরি খনিজ উপাদান।
কী কী উপকারে আসে?
স্থানীয়দের দাবি, এই কাই চাটনি আসলে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এর ঔষধি গুণ চমকে দেওয়ার মতো:
সর্দি ও কাশি: সাধারণ সর্দি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি হুপিং কাশির সমস্যা কমাতেও এর জুড়ি মেলা ভার।
চোখ ও পেটের স্বাস্থ্য: চোখের জ্যোতি বাড়ানোর পাশাপাশি পেটের গোলমাল ও ব্যথা কমাতেও এর ব্যবহার বহু পুরনো।
মস্তিষ্কের উন্নতি: বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মতো রোগ ঠেকাতে এবং মানসিক অবসাদ কাটাতে এটি দারুণ উপকারী।
এনার্জি বৃদ্ধি: এটি যৌবনের শক্তি ধরে রাখতে এবং শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে।
পরিবেশ ও পুষ্টিবিদের মত
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকায় মাছ-মাংস পৌঁছানো কঠিন এবং তা বেশ দামি। সেই প্রোটিনের বিশাল ঘাটতি একাই মেটাচ্ছে এই চাটনি।
কীভাবে তৈরি হয় এই চাটনি?
জঙ্গল থেকে লাল পিঁপড়ে ও ডিম সংগ্রহ করে জলে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর শিলনোড়ায় কচি লার্ভা ও জোয়ান পিঁপড়ে একসঙ্গে বেটে নেওয়া হয়। স্বাদ বাড়াতে মেশানো হয় রসুন, আদা বাটা, ধনেপাতা এবং সামান্য গরম জল। কোনও রাসায়নিক ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি এই চাটনি শালপাতায় মুড়ে বিক্রি হয় স্থানীয় বাজারে। যা দিয়ে বহু মানুষের সংসারও চলে।
সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, লাল পিঁপড়ে মানেই শুধু ভয়ংকর কামড় নয়। সঠিক উপায়ে রাঁধতে জানলে, এটি আমাদের শরীরের জন্য এক অসাধারণ এবং সুস্বাদু ওষুধ।
সাবধানতা কোথায়?
সব ভালো হলেও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁদের চিংড়ি বা খোলসযুক্ত সামুদ্রিক খাবারে (শেলফিশ) অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের পতঙ্গ জাতীয় খাবার থেকেও মারাত্মক অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি, জঙ্গল থেকে সংগ্রহের সময় খেয়াল রাখতে হবে, সেই গাছে যেন কোনও রাসায়নিক কীটনাশক দেওয়া না থাকে। দূষিত পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা ডিম পেটে গেলে মারাত্মক বিষক্রিয়া হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সঠিক প্রজাতির পিঁপড়ের ডিম পরিচ্ছন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা হলে, তা আপনার ডায়েটে একটি দারুণ পুষ্টিকর সংযোজন। আসল কাজ হল সঠিক প্রজাতির ডিম চেনা এবং অ্যালার্জির বিষয়ে সচেতন থাকা। বিজ্ঞান বলছে, এই শর্তগুলো মানলে ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ১০০ শতাংশ নিরাপদ এবং উপকারী।