Mithu Mukherjee: ছিলেন কলকাতার ‘রেখা’, যাঁকে ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ বলে ভালোবেসেছিল বাঙালি! তবুও কেন অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন মিঠু?

Mithu Mukherjee Bengali Actress Biography: ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী কমেডি ছবি ‘মৌচাক’। একদিকে উত্তম কুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো মেগাস্টাররা, অন্যদিকে রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে চঞ্চল নায়িকা মিঠু! পর্দায় তাঁদের কেমিস্ট্রি এতটাই জমে গিয়েছিল যে সিনেমাটি ব্লকবাস্টার হিট হয়। আর সেই ছবিতে মিঠুর কণ্ঠে ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি...’ গানটি তো সত্তর দশকের তরুণ-তরুণীদের কাছে ভালোবাসার এক প্রকাশ্য ইশতেহার হয়ে উঠেছিল।

Mithu Mukherjee: ছিলেন কলকাতার রেখা,  যাঁকে ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ বলে ভালোবেসেছিল বাঙালি! তবুও কেন অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন মিঠু?

|

Sep 21, 2026 | 1:11 PM

সাতের দশক। সাদা-কালো সেলুলয়েডের সেই ধুসর ক্যানভাসেই যেন রঙিন বসন্ত নিয়ে এসেছিলেন এক তরুণী। কেবল দেবীর মতো রূপই নয়, সঙ্গে চাবুকের মতো ছিপছিপে শরীর আর তুখোড় অভিনয়—যার সম্মোহনে সেই যুগে কুপোকাত হয়েছিলেন হাজার হাজার বাঙালি পুরুষ। তিনি মিঠু মুখোপাধ্যায়। যাঁর রূপের ছটা দেখে সেই সময় অনুরারাগীরা অনেকেই নাম দিয়েছিলেন কলকাতার রেখা। ভারতীয় সেলুলয়েডে জনপ্রিয়তার শীর্ষে গিয়েও, কেন নিজেকে অন্তরালে নিয়ে যান বাঙালির প্রিয় মর্জিনা?

‘মর্জিনা-আবদুল্লা’ সিনেমার সেই বিখ্যাত নাচ—‘যায় যায় প্রাণ যায়’, কিংবা মান্না দে-র সুরসাধনায় ‘বাজে গো বীণা’ গানে তাঁর চোখের কটাক্ষের জাদু, আর ‘মার ঝাড়ু মার’-এর সেই খুনসুটি—পর্দার দিকে থেকে চোখ ফেরানো দায় ছিল দর্শকের। ‘মর্জিনা’ চরিত্রে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের সেই আত্মপ্রকাশ কার্যত তৎকালীন বাঙালি দর্শকের মনের মণিকোঠায় পাকা স্থান করে দিয়েছিল তাঁকে।

১৯৭১-৭২ সাল নাগাদ চিত্র পরিচালকের হাত ধরে রুপোলি জগতে পা রেখেছিলেন মিঠু। চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ ছবিতে তাঁর অভিষেক হলেও, ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হন ১৯৭৩ সালে। দীনেন গুপ্তর ‘মর্জিনা-আবদুল্লা’ ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করার পর থেকে আর কোনওদিন পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই রূপসীকে। এর পর ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী কমেডি ছবি ‘মৌচাক’। একদিকে উত্তম কুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো মেগাস্টাররা, অন্যদিকে রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে চঞ্চল নায়িকা মিঠু! পর্দায় তাঁদের কেমিস্ট্রি এতটাই জমে গিয়েছিল যে সিনেমাটি ব্লকবাস্টার হিট হয়। আর সেই ছবিতে মিঠুর কণ্ঠে ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি…’ গানটি তো সাতের দশকের তরুণ-তরুণীদের কাছে ভালোবাসার এক প্রকাশ্য ইশতেহার হয়ে উঠেছিল।

এরপর মিঠুর কেরিয়ার যেন এক ধূমকেতুর মতো গতি পায়। ‘নিশিকন্যা’, ‘কবীর’-এর মতো একের পর এক হিট ছবি। রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে জুটি বেঁধে উপহার দেন অনন্য এক ছবি ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, যা মৌচাকের চেয়ে একেবারেই আলাদা স্বাদের গল্প ছিল। শুধু তা-ই নয়, মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতেও নায়িকা হিসেবে চুটিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি; যার মধ্যে ‘হোটেল স্নো ফক্স’ এবং ‘চাঁদের কাছাকাছি’ অন্যতম।

বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে মুম্বইয়ের বলিপাড়াতেও নিজের দক্ষতার ছাপ ফেলেছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৬ সালে দুলাল গুহর ‘খান দোস্ত’ ছবির মাধ্যমে হিন্দিতে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে বাসু চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘দিললগি’, ‘সফেদ ঝুট’, ‘দো লাড়কে দোনো কাড়কে’-র মতো বেশ কিছু হিন্দি ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসা পায়। তবে মায়ানগরী মুম্বইয়ের ঝকমকে দুনিয়া খুব একটা মন টানেনি বাংলার এই ক্রাশের। তিনি আবার ফিরে আসেন কলকাতায়।

কিন্তু ততদিনে টলিউডের হাওয়া অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। পর্দায় রাজত্ব করছেন মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়ের মতো নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীরা। কিছু বাংলা ছবি করলেও আগের মতো ম্যাজিক তৈরি হচ্ছিল না। কিন্তু মিঠু মুখোপাধ্যায় যে লড়াই না করে মাঠ ছাড়ার পাত্রী নন! ১৯৮৯ সালে চন্দ্র বারোটের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘আশ্রিতা’। কনওয়ালজিৎ সিংয়ের বিপরীতে মিঠুর কাজ ফের আলোড়ন ফেলেছিল টলিউডে।

আর ঠিক তার পরেই, সাফল্যের আলো গায়ে মেখেই হুট করে রুপোলি পর্দা থেকে উধাও হয়ে যান মিঠু মুখোপাধ্যায়। লাইমলাইট থেকে চিরতরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে মুম্বইয়ে একপ্রকার নিভৃতবাস বেছে নেন তিনি। গ্ল্যামারের ঝকমকে আলো যখন মধ্যগগনে, হয়তো তখনই বিদায় নিতে চেয়েছিলেন তিনি—যাতে ভক্তদের হৃদয়ে তাঁর সৌন্দর্য আর অভিনয়ের সেই উজ্জ্বল স্মৃতি চিরকালের জন্য অমর হয়ে থাকে! সিনেমার পর্দার সেই রূপসী কন্য়া এবার চলে গেলেন একেবারেই অন্তরালে। শুধুই রয়ে গেল, তাঁর সেই মারকাটারি চাউনি আর উজ্জ্বল হাসি।

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us