
টলিপাড়ায় অশান্তির আবহাওয়া। প্রযোজক অর্ক গঙ্গোপাধ্যায়, যাঁর প্রযোজনা সংস্থার নাম অরগ্যানিক স্টুডিয়োজ প্রাইভেট লিমিটেড, কম্পিটিশন কমিশন অফ ইন্ডিয়ার কাছে প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় এবং আর্টিস্টস ফোরামের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা করেছেন। অর্কর দাবি, ৫ জুন সেই নোটিশ পাঠানো হয়েছে, প্রসেনজিত্, শান্তিলাল এবং ২১ জন এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যকে। প্রসেনজিত্ রয়েছেন কার্যকরী সভাপতি পদে, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় রয়েছেন সাধারণ সম্পাদক পদে।
ঘটনার সূত্রপাত রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকালমৃত্যুকে কেন্দ্র করে। ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’ প্রযোজনা সংস্থার একটি ধারাবাহিকের জন্য শুটিং করতে গিয়ে প্রাণ হারান রাহুল। শুটিংয়ে কী ধরনের গাফিলতি ছিল, যার জন্য সমুদ্রে শুটিংয়ে নেমে আর প্রাণ বাঁচেনি রাহুলের, তার তদন্ত চেয়ে রাহুলের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার এফআইআর করেছেন। সেই ঘটনার তদন্ত চলছে। ম্যাজিক মোমেন্টস-এর কর্ণধার লীনা গঙ্গোপাধ্যায় এবং শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে অর্কর প্রযোজনা সংস্থার ধারাবাহিকের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম। রাহুলের মৃত্যুর পর টলিপাড়ায় টেকনিশিয়ানদের ফেডারেশন (তখন সভাপতি ছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস, যাঁকে এখন গ্রেফতার করা হয়েছে) এবং আর্টিস্টস ফোরাম একদিনের কর্মবিরতি ঘোষণা করে। তারপর ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-এর ধারাবাহিকের পাশাপাশি অর্কর প্রযোজনায় ‘কনে দেখা আলো’ ধারাবাহিকের শুটিং করবেন না তাঁরা, সেই সিদ্ধান্ত জানানো হয় সাংবাদিক বৈঠকে। যদিও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কিছু শিল্পীই প্রথমে সমাজ মাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দেন। আর্টিস্টস ফোরাম আবার বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়, কিছু শর্ত সাপেক্ষে ‘কনে দেখা আলো’-র শুটিংয়ে যোগ দেবেন তাঁরা। এরপর শুটিং শুরু হয়ে যায়।
টিভি নাইন বাংলার কাছে অর্কর দাবি, ”যে পদ্ধতিতে আমাদের ধারাবাহিকের শুটিং বন্ধ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। গত এক বছরে আমাদের কাজ চারবার বন্ধ করা হয়েছে, এবং প্রতিটি ঘটনাই যথাযথভাবে ডকুমেন্টেড। প্রতিবারই আমরা অসংখ্য ই-মেল ও লিখিত যোগাযোগের মাধ্যমে জানতে চেয়েছি কাজ বন্ধ করার কারণ কী। আর্টিস্টস ফোরাম বা ফেডারেশন, কেউই আমাদের সাথে সরাসরি কথা বলার সৌজন্যও দেখাননি। নিজের ইচ্ছে মতো ফরমান জারি করে দিয়েছে।আর্টিস্টস ফোরামের বর্তমান কমিটির বৈধতাই গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সংগঠনের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ উপস্থিত না থাকলে নির্বাচন বৈধভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। অথচ সেই মৌলিক শর্ত পূরণ না করেই বর্তমান কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান নেতৃত্ব যে নির্বাচনের ভিত্তিতে নিজেদের পদে বহাল বলে দাবি করছে, সেই নির্বাচন ম্যানুপুলেশন-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে বলেই আমাদের অভিযোগ। ফলে এঁদের প্রকৃত অর্থে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা যায় না। সেই কারণে এঁরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেগুলিকে সংগঠনের বৈধ সিদ্ধান্ত না ধরে পার্সোনাল ক্যাপাসিটি-তে গৃহীত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই কারণেই সংশ্লিষ্ট পদাধিকারীদের পার্সোনাল পার্টি করা হয়েছে। বর্তমান অভিযোগ মূলত দুটি বিষয়ে ভিত্তি করে গঠিত। প্রথমত, কম্পিটিশন-এর সেকশন থ্রি-এর অধীনে ফোরাম-এর মাধ্যমে কালেক্টিভ বয়কট, রিফিউজাল টু ডিল এবং কনসার্টেড অ্যাকশন সংগঠিত হয়েছে, যার ফলে আমাদের ব্যবসায়িক কাজ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেকশন ফোর-এর অধীনে ফোরাম বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি-তে তার প্রভাব খাটিয়ে আমাদের ব্যবসায়িক কাজে হস্তক্ষেপ ও বাধা সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা বা যোগাযোগ না করেই তারা সরাসরি আমাদের ক্লায়েন্ট (চ্যানেল)-এর উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তারা এমন কিছু শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা আরোপ করার কোনও আইনগত, কনট্র্যাকচুয়াল বা অরগ্যানাইজেশনাল অথরিটি তাদের নেই। সাংবাদিক বৈঠকে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে—যেমন, “আমরা ব্যান শব্দটি বলব না, সাসপেন্ড বলব”—তা থেকেই স্পষ্ট যে গৃহীত পদক্ষেপগুলির প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে তারা সচেতন ছিল এবং ব্যবহৃত টার্মিনোলজি-র পিছনে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কাজ করছিল। আমরা আরও প্রশ্ন তুলছি যে, যখন কোনও প্রযোজক, যিনি নিজেও ইন্ডাস্ট্রি-এর একজন প্রতিযোগী এবং অন্যান্য প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় রয়েছেন, তিনি অন্য একটি প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তখন তার পিছনে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক ইন্টারেস্ট কাজ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত দেড় বছরে বিভিন্নভাবে আর্টিস্টস ফোরাম এবং ফেডারেশন-এর যৌথ পদক্ষেপের মাধ্যমে আমাদের বারবার টার্গেট করা হয়েছে। এই বেআইনি ও একতরফা পদক্ষেপের ফলে আমাদের দু’টি নতুন ধারাবাহিকের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে আমরা গুরুতর আর্থিক ক্ষতি এবং রেপুটেশনাল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই ক্ষতির পরিমাণ ৩০ কোটিরও বেশি।”
লক্ষণীয় কিছুদিন আগে আর্টিস্টস ফোরাম ছেড়েছেন দিগন্ত বাগচী। টিভি নাইন বাংলাকে দিগন্ত বলেছিলেন, ” ৮ ফেব্রুয়ারি আর্টিস্টস ফোরামের নির্বাচন হয়। আমি ১৪ ফেব্রুয়ারি রেজিগনেশন দিতে চাই। অনেক কিছু ঠিক লাগছিল না। কমিটি তৈরিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিল না। তবে আমাকে তখনই রেজিগনেশন দিতে বারণ করার পর অপেক্ষা করি। রাহুলের (অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের) মৃত্যুর ঘটনায় জটিলতা বাড়ে। তবে এখন কিছুটা সময় কেটে গেলেও, পরিস্থিতি বদলায়নি। তাই রেজিগনেশন দিয়েছি।’’
আর্টিস্টস ফোরাম যখন সিদ্ধান্ত নেয়, ‘কনে দেখা আলো’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ে সদস্যরা যাবেন না, তখন দেবদূত ঘোষ আর দিগন্ত বাগচী এই ধারাবাহিকের তিন সদস্যকে হুমকি দিয়েছিলেন বলে, অর্কর অভিযোগ। তাঁরা শুটিংয়ে গেলে সমস্যা হবে, এমনই বলা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে দিগন্ত কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে তিনি অর্কর প্রযোজনা সংস্থা থেকে পাওয়া আইনি নোটিশের উত্তরে, ভুল সংশোধন করে নিতে চেয়ে প্রযোজনা সংস্থাকে চিঠি দিয়েছেন বলে খবর। দেবদূত জানালেন, ”আমি কখনওই গলা তুলে কথা বলার পক্ষে নই। যখন একটি সংগঠনের পদ রয়েছি, তখন সকলের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, সদস্যকে জানাতেই ফোন করেছিলাম। সেটা আমার দায়িত্ব। তবে কোনওভাবেই হুমকির সুর ছিল না আমার কথায়।”
টিভি নাইন বাংলা তরফে সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আর্টিস্টস ফোরামকে ঘিরে আইনি জটিলতা নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া? তিনি বলেছেন, ”সময় বলবে।” এখন দু’ পক্ষের আইনি জটিলতা কোন মোড় নেয়, তার কী প্রভাব পড়ে টলিপাড়ায়, তা দেখার অপেক্ষা।