
তখনও এই শহর জানে না বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা হেরে যাবে। নীল-সাদা জার্সির টিম রাহুল অরুণোদয় বন্দ্য়োপাধ্যায়ের প্রিয় দল ছিল। জোট বেঁধে বন্ধুদের মাঝে রাহুল গলা ফাটাতেন মেসির জন্য। বিজয়গড়ের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠে ড্রয়িংরুমে পৌঁছতেই দেখা গেল কুট্টুসের দুষ্টুমি। রাহুলের পোষ্য। রাহুল চলে যাওয়ার পর সে মনমরা হয়ে ছিল বহুদিন। এখন তুলনায় ভালো।
এই বাড়িতে অভিনেতার শরীরটাই নেই। সারা বাড়ি তাঁকে মিস করে চলেছে অনবরত। রাহুলের মা শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায় বসলেন ‘সহজ কথা’-র ঘরে। এই ঘরে কয়েক সেকেন্ড চোখ বুলিয়ে নিয়ে রাহুলের সব পছন্দ সামনে চলে আসে। সিনেমার পোকা রাহুলের ছবির কালেকশন দেখলে যে কোনও মানুষের মন হু-হু করে উঠবে। ঈর্ষা করার মতো এ বাড়ির লাইব্রেরি। এক কোণে চোখে পড়ে ‘দাদাগিরি’-র পাঁচটা ট্রফি। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রশ্নবাণের মুখে রাহুল সব সময়ে জিতে আসতেন।
২৯ মার্চ থেকে ১৯ জুলাই, রাহুলের মৃত্যুর পর ন্যায় বিচার চেয়ে এতগুলো দিন অতিবাহিত। তদন্ত কোন পথে এগোচ্ছে, কিছু কি জানতে পারলেন? শ্যামলী দেবী বললেন, ”এই ব্যাপারে সত্যি কিছু বলতে পারব না। কিছুই সেরকম জানি না। তবে বিষয়টা জানতে হবে। তার জন্য অপেক্ষা করছি এখনও।” ২৪ জুলাই মুক্তি পাবে ‘ছবিওয়ালা’। এই ছবির নামভূমিকায় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্য়োপাধ্যায়। আর তাঁর সঙ্গে রয়েছেন দেবলীনা দত্ত, অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। উজান গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ছবি ‘কাতুকুতু বুড়ো’-তে দেখা যাবে রাহুলকে। প্রথম ছবিটিতে রাহুলের মৃত্যুৃ-দৃশ্য রয়েছে। সেখানেও জলে ডুবে মৃত্যু রাহুলের চরিত্রের। রাহুলের কাজগুলো যে পরপর আসছে, সেটা শ্যামলী দেবী কতটা ভালোলাগার জায়গা? ”আমার বাবিন বলত, ‘জানো মা, ‘নাম’ হলো মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস।’ তাই ওর নামটা যতটা বেশি উচ্চারিত হবে, ওর নামটা তত ছড়িয়ে পড়বে। রাহুলের একটা ভালোবাসার জায়গা আছে। রাহুল বলুন, অরুণোদয় বলুন, আবার পাড়াতে ওকে সবাই বাবিন নামে ভালোবাসে। ওর নাম উচ্চারিত হলে, ও সকলের মধ্যে থাকবে। ‘ছবিওয়ালা’-তে ওর প্রধান চরিত্র, বাবা-ছেলের দ্বৈত চরিত্র করছে, যে কোনও শিল্পীর কাছে এটা চ্যালেঞ্জ। রাহুল ‘থাকলে’ বলতে পারি না। আমি বলি, রাহুল আছে। রাহুল খুব খুশি হতো, ওর নাম সকলের মুখে-মুখে ঘুরছে দেখলে।”
এই কথা বলার সময়েই শ্যামলী দেবীর চোখে জল এসে গেল। তিনি বললেন, ”আজকে আপনি এসেছেন, আজকেই তো আর্জেন্টিনার খেলা। ও মেসির অন্ধভক্ত। আজকে আমি যতটা পারব খেলার সামনে বসব, দেখার চেষ্টা করব। জানেন, বিশ্বকাপ শুরু হলেই ও আর্জেন্টিনার জার্সি নিয়ে এসে সব বন্ধুদের দিত। খেলার দিনে আমার বাড়িতে হইহই হতো। এই ঘরে বসে ও প্রিয় বন্ধুদের নিয়ে খেলা দেখত। এটা ওদের জন্য লাকি ঘর ছিল। জিতে তারপর গাড়ি নিয়ে হইহই করতে বেড়িয়ে পড়ত ওরা। আবার বাবিন নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করত, মেসি আর বিশ্বকাপ খেলবে না বলে। আমি যতটা পারি বসব। চাই মেসি জিতুক। খেলা শেষের পর ওরা জার্সি খুলে নাচ-গান করত। হইহই করে বেড়িয়ে পড়ত…”, এই কথা বলার সময়ই চোখে জল চলে এল শ্যামলী দেবীর। দুই চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, রাহুলের বন্ধুরা এক জায়গায় হতে পারেননি এই বছর। তাঁরা আলাদা করে খেলা দেখছেন। রাহুলের কথা ভেবেই তাঁরা একজায়গায় বসেননি।
রাহুলের ছবি কি শ্যামলী দেবী দেখতে যাবেন? তিনি পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললেন। তাঁর কথায়, ”এটার জন্য আমাকে প্রস্তুত হতে হবে। সম্প্রতি রাহুলের নাটকের দলের সৌরভ পালোধীর ছবি আমি দেখতে গিয়েছিলাম। ছবিটা দেখছিলাম, কিন্তু মনের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছিল। ওর পডকাস্ট বা ছবির কিছু অংশ হয়তো আমি দেখি। তবে পুরোটা দেখতে পারি না। রাহুলের মৃত্যু-দৃশ্য থাকলে আমি দেখতেই পারব না। আমার খুব কষ্ট হবে। যাঁরা আমায় নিয়ে যাবেন, হয়তো তাঁদের অসুবিধায় ফেলা হয়ে যাবে।”
রাহুলের নাম বা কাজ যাঁরা সামনে আনছেন, তাঁদের অনেক সময় নেগেটিভ মন্তব্য শুনতে হচ্ছে। রাহুলের মৃ্ত্যুকে ব্যবহার করে প্রচার নেওয়া হচ্ছে কি, এমন সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। তা নিয়ে কী মনে হয়? শ্যামলী দেবী বললেন, ”এটা মানসিকতার ব্যাপার। তবে রাহুলের যাঁরা বন্ধু, ওর যাঁরা সহকর্মী, ভালোবাসার মানুষ, তাঁরা ওর কথাটাই বারবার হয়তো বলছে। ওর নামটা সামনে আনছে। আমি সেটাকে পজিটিভভাবে দেখি। রাহুলের নামটা যে উচ্চারিত হচ্ছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনও অর্থ নেই। ওর নামটা যে উচ্চারিত হচ্ছে, ও যে প্রাধান্য পাচ্ছে, সেটা রাহুলকে ভালোবেসে, উদযাপন করেই লোকে বলছেন। এর মধ্যে খারাপ কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।”
এসব কথা বলতে-বলতেই অনেকটা রাত। কুট্টুস তখনও খেলার মুডে। দরজা দিয়ে বেরনোর সময়ে চোখে পড়ল, বাড়ির নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা…