Raja Sen Demise: রইল পড়ে মুকুট, দিকশূন্যপুরে চললেন রাজা সেন

Director Raja Sen: 'কাট' বলল জীবন, রুপোলি পর্দার চেনা জগৎ থেকে পাকাপাকিভাবে বিদায় নিলেন বর্ষীয়ান পরিচালক রাজা সেন। দীর্ঘ শারীরিক যন্ত্রণার পর রবিবার এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনবারের জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই গুণী শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা টলিপাড়া, এক লহমায় অবসান হল বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক সুদীর্ঘ সোনালি অধ্যায়ের। তবে মৃত্যুর কাছে শিল্পীর শরীর হার মানলেও, 'দামু' বা 'সুবর্ণলতা'র মতো অমর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তিনি দর্শকের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকবেন।

Raja Sen Demise: রইল পড়ে মুকুট, দিকশূন্যপুরে চললেন রাজা সেন

Aug 16, 2026 | 2:55 PM

মুকুটটা তো পড়ে আছে , রাজাই শুধু নেই…। রবিবার ছুটির দিনে জীবন থেকে ছুটি নিলেন প্রবীণ পরিচালক রাজা সেন। তাঁর রেখে যাওয়া মুকুটে রয়েছে তিন দশকের বেশি সময় ধরে সৃষ্টি করা নানা মণি-মুক্তের কারুকাজ। দামু, দেশ, ল্যাবরেটরি, আদর্শ হিন্দু হোটেল, আরোগ্য নিকেতন এমন কত হিরে-মতি খচিত রত্ন দিয়ে গেলেন বাংলা সিনেমাকে। রাজা সেন এমন এক দুর্লভ পরিচালক যাঁর বিচরণ শিশু থেকে বৃদ্ধ মনে। তাঁর প্রথম সিনেমা দামু বাঙালির মননে গভীর আঁচড় রেখেছে আজও। অভিষেকেই তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার। রাজার মুকুটে এও এক উজ্বল পালক।

আজ আর লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের ব্যস্ততা আর নেই। রুপোলি পর্দার জন্য আর কোনও দিন নতুন করে ফ্রেম সাজাবেন না তিনি। ‘দামু’ ছবির কাণ্ডারী আর নেই! সব ব্যস্ততা, সব কোলাহল সরিয়ে রেখে জীবনের সেট থেকে চিরকালের মতো বিদায় নিলেন প্রবীণ পরিচালক রাজা সেন। সম্প্রতি পরপর দু’বার হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর এসএসকেএম হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু শেষরক্ষা আর হল না। রবিবার হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। স্ত্রী পাপিয়া সেন, দুই মেয়ে শুভশ্রী ও শ্রেয়সী এবং নাতনি মিশকা ও জুয়ানাকে একা ফেলে দিকশূন্যপুরে পাড়ি দিলেন তিনি।

তাঁর এই চিরবিদায়ের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার গল্প। বছর খানেক আগে ‘মায়ামৃদঙ্গ’ সিনেমার শুটিং সেটে আচমকাই পড়ে গিয়ে কোমরে মারাত্মক চোট পেয়েছিলেন তিনি। শিল্পের তাগিদে নিজের সেই ব্যথাকে হয়তো সেদিন তেমন গুরুত্ব দেননি। আর সেটাই কাল হল। দশ বছর আগেকার এক পুরনো সমস্যা সেসময়েই বড় আকারে থাবা বসায় পরিচালকের শরীরে। সেই অবহেলারই চরম মাশুল গুনতে হয়েছে তাঁকে। তারপর থেকেই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও তাঁর তীব্র কষ্ট হত। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর একটি বড়সড় অস্ত্রোপচারও হয়েছিল। সবাই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো ঠিক ঘুরে দাঁড়াবেন। কিন্তু সাময়িক আশা জাগিয়েও শেষমেশ পরিস্থিতি চরম আকার নেয়। চিকিৎসকদের সব আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরতরে চোখ বুজলেন পরিচালক।

চিরকালের মতো চলে গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর কাজ দর্শকের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। ছোটপর্দা থেকে বড়পর্দা, সর্বত্র তিনি নিজের প্রতিভার অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গিয়েছেন। ১৯৯৭ সালে তাঁর তৈরি ‘সুবর্ণলতা’ ধারাবাহিক আজও বাঙালি দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে। ছোটপর্দায় ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’ বা ‘দেশ আমার দেশ’-এর মতো সাহিত্য নির্ভর কাজকে তিনি যেভাবে মেগা ধারাবাহিক হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এক কথায় অনবদ্য।

আপামর বাঙালির কাছে তিনি যেমন ‘দামু’ সিনেমার স্রষ্টা হিসেবে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন, তেমনই তাঁর অন্যান্য কাজও সমান উজ্জ্বল। ১৯৯৬ সালের সেই অনবদ্য শিশুচলচ্চিত্র আজও দর্শকদের কাছে এক নিখাদ নস্টালজিয়া। দামুর সেই সরলতা, হাতির পিঠে চড়ে তার সেই রোমাঞ্চকর যাত্রা, রাজা সেনের স্পর্শেই বড়পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। তবে তিনি শুধুই তো ‘দামু’র পরিচালক নন! তাঁর সৃষ্টি কখনও কোনও একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে থাকেনি, সিনেমা ও ধারাবাহিক দুই মাধ্যমেই বারবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন তিনি।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জীবনে তিনবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ১৯৯৩ সালে কিংবদন্তি সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র, ১৯৯৬ সালে সেরা শিশুচলচ্চিত্র হিসেবে ‘দামু’, এবং ১৯৯৯ সালে সেরা পারিবারিক সিনেমা হিসেবে ‘আত্মীয় স্বজন’ তাঁকে জাতীয় স্তরে সেরার সম্মান এনে দেয়।

পরিচালক হিসেবে তাঁর ঝুলিতে রত্নের অভাব নেই। ‘চক্রব্যূহ’, ‘দেবীপক্ষ’ কিংবা ‘তিনমূর্তি’-র মতো সিনেমাগুলি বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অমূল্য সম্পদ। তাঁর পরিচালিত ‘দেশ’ ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন জয়া বচ্চন ও অভিষেক বচ্চন। বলিউড অভিনেত্রী রবিনা ট্যান্ডনও বাংলা সিনেমায় পা রেখেছিলেন তাঁর ‘ল্যাবরেটরি’ (২০১০) ছবির হাত ধরেই। আবার সুপারস্টার জিতের কেরিয়ারের প্রথম অন্য ধারার সিনেমা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর কাণ্ডারীও ছিলেন তিনি। ‘মৌবনে আজ’, ‘কর্নেল’ কিংবা ২০১৯ সালের সিনেমা ‘ভালবাসার গল্প’— তাঁর প্রতিটি কাজই নিখুঁত শিল্পসত্তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমার পাশাপাশি তপন সিনহা, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো দিকপালদের নিয়ে তাঁর তৈরি তথ্যচিত্রগুলি চিরকাল অমূল্য হয়ে থাকবে। বিনোদন জগতে যে গভীর শূন্যতা তিনি তৈরি করে গেলেন, তা আর কখনও পূরণ হওয়ার নয়। মৃত্যুর কাছে শিল্পীর শরীর হার মানলেও, তাঁর সৃষ্টি অমর। দর্শকের হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন।

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us