প্রসেনজিতের উপর ক্ষোভ পরিচালক সুমনের! বিষয়টি জেনেই অভিনেতা বললেন…

আজ মুক্তি পাচ্ছে বাংলা ছবি 'অভিমান'। সেই ছবি মুক্তির দিনে পরিচালক সুমন ঘোষ ক্ষোভ উগরে দিলেন প্রসেনজিত্‍ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। সুমন লিখেছেন, ''অত্যন্ত ভারী মন নিয়ে তোমায় এই চিঠি লিখছি। শিল্পের সততা ও নৈতিকতা নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন বুকে চেপে বসেছে, যা আমার মতো একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে বিচলিত করছে। সৃজনশীলতা বা শিল্পের মূল ভিত্তি কী? শুধুই একটা চূড়ান্ত সৃষ্টি, নাকি সেই সৃষ্টি তৈরি হওয়ার পিছনের পারস্পরিক বিশ্বাস, সততা ও নৈতিকতা? গত আড়াই বছর ধরে তোমার সাথে আমি একটি চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনা করছি।

প্রসেনজিতের উপর ক্ষোভ পরিচালক সুমনের! বিষয়টি জেনেই অভিনেতা বললেন...

|

Jun 19, 2026 | 3:15 PM

আজ মুক্তি পাচ্ছে বাংলা ছবি ‘অভিমান’। সেই ছবি মুক্তির দিনে পরিচালক সুমন ঘোষ ক্ষোভ উগরে দিলেন প্রসেনজিত্‍ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। সুমন লিখেছেন, ”অত্যন্ত ভারী মন নিয়ে তোমায় এই চিঠি লিখছি। শিল্পের সততা ও নৈতিকতা নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন বুকে চেপে বসেছে, যা আমার মতো একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে বিচলিত করছে। সৃজনশীলতা বা শিল্পের মূল ভিত্তি কী? শুধুই একটা চূড়ান্ত সৃষ্টি, নাকি সেই সৃষ্টি তৈরি হওয়ার পিছনের পারস্পরিক বিশ্বাস, সততা ও নৈতিকতা? গত আড়াই বছর ধরে তোমার সাথে আমি একটি চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনা করছি। অত্যন্ত যত্ন ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি স্ক্রিপ্ট গড়ে তুলেছিলাম— ‘স্টার’। আর তার চরিত্রচিত্রণে স্টার হিসাবে শুরু থেকেই তোমাকে ভেবে এসেছি। এই আড়াই বছরে তোমার মতো একজন সিনিয়র, খ্যাতনামা অভিনেতার সঙ্গে আমার বেশ কয়েকটি মিটিং হয়েছে। তোমায় ভেবেই চরিত্রটির দুটি ভিন্ন বয়স ও রূপ সাজানো হয়েছিল—১) জরাগ্রস্ত, অবক্ষয়ী রূপ এবং ২) তরতাজা যৌবনের ইমেজ। এমনকি হোমওয়ার্ক হিসেবে আমি তোমায় নেটফ্লিক্সের ‘এলভিস’ সিনেমাটি দেখতে বলেছিলাম। যদিও সেটি একজন মিউজিক সুপারস্টারকে নিয়ে, তবুও আমাদের ছবির ভাবনার সাথে তা প্রাসঙ্গিক ছিল। শেষবার, গত ডিসেম্বর মাসে আমাদের কথা চূড়ান্ত হয় যে ‘এনআইডিয়াজ’ ছবিটি প্রযোজনা করবে এবং সেই অনুযায়ী আমার প্রোডাকশন কোঅর্ডিনেটর একটি বাজেটও তোমাকে পাঠায়। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং বেদনাদায়ক যে, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া তোমার “অভিমান” ছবির টিজার এবং ট্রেলারে প্রায় হুবহু একই রকম চরিত্রায়ণ, একই রকম দৃশ্য এবং উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে,

​১. তোমার দুটি লুক—একটি সুপারস্টার, অন্যটি জরাগ্রস্ত।
২. সেই সুপারস্টারের হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়া।
৩. উধাও পরবর্তী এক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে থাকা
৪. মস্তিষ্ক জনিত অসুখে হুইলচেয়ারে বসা দৃশ্যগুলো।
৫. নিজের (কম বয়সের) ছবি ভেঙে ফেলা।
৬. একজন বিশ্বস্ত ম্যানেজার (আমিও এই চরিত্রের জন্য কাঞ্চনকে ভেবেছিলাম তুমি জানতে)। ​সিনেমাটিতে আরও কতটা কী ওভারল্যাপ করবে জানি না। ধরে নিচ্ছি চিত্রনাট্য আলাদা কিন্তু চরিত্রটা তো একই। অতএব আমার ও আমার দলের স্টার নিয়ে দুবছরের খাটনি বৃথা গেলো। যদি ধরেও নিই এগুলো কেবলই কাকতালীয়, তবুও তোমার তো ‘স্টার’-এর স্ক্রিপ্টটি প্রায় মুখস্থ ছিল। বিবেকের কাছে একবারও কি মনে হলো না যে আমাকে অন্তত জানানো উচিত ছিল? উপরন্তু, যখন আমি বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি, তখন অদ্ভুত এক নিশ্চলতায় আমার মেসেজগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছ তুমি। এখন বুঝতে পারছি, কেন।
​এই ইন্ডাস্ট্রির বহু নামী এবং কিংবদন্তি শিল্পীর সাথে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে—যেমন সৌমিত্রকাকু, মিঠুনদা, শর্মিলা ঠাকুর বা অপর্ণা সেন। এঁদের কাছ থেকে প্রফেশনাল এথিক্স শেখা উচিত। এঁদের কারও কাছ থেকে এমন আচরণ অবিশ্বাস্য। তাই তোমার মতো একজন সিনিয়র অভিনেতার কাছ থেকে এই চরম অসৌজন্যমূলক উপেক্ষা এবং অনৈতিক আচরণ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমার প্রশ্নটা কোনও আইনি লড়াই বা কপিরাইটের অধিকারের নয়; আমার প্রশ্নটা শিল্পের আদিম সততা নিয়ে, বিশ্বাস এবং নৈতিকতা নিয়ে। একজন লেখক বা পরিচালক যখন আড়াই বছর ধরে তাঁর স্বপ্ন এবং নিষ্ঠা কোনও অভিনেতার সামনে উজাড় করে দেন, তখন সেই বিশ্বাসের মর্যাদা কি এতটাই ঠুনকো? প্রতিষ্ঠিত নাম এবং ক্ষমতার জোরে একজন স্বাধীন পরিচালকের আইডিয়া বা ক্যারেক্টারাইজেশনকে এভাবে কি নিঃশব্দে আত্মসাৎ করে নেওয়া যায়? যদি ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা একজন মানুষের সাথে এমন আচরণ হতে পারে, তবে নতুন যে ছেলেমেয়েরা শুধুমাত্র গল্প বলার স্বপ্ন নিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখছে, তারা কি আর প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জীদের ওপর ভরসা রাখতে পারবে? আমি বছরে বড়জোর একটা ছবি বানাই এবং তাতে আমার পুরো সত্তা ঢেলে দিই। কিন্তু যারা নতুন কাজ করতে আসছে, চোখে শিল্পের, সাধনার ও উৎসাহের নতুন চশমা নিয়ে, তাদের কী হবে? আশা রাখবো তাদের সাথে যেন আগামী দিনে এমন আচরণ না হয়; কোনও শিল্পীর নিষ্ঠা ও ডেডিকেশনকে যেন এভাবে অবহেলা না করা হয়। শিল্প টিকে থাকে সততায়, ক্ষমতার দম্ভে নয়। তোমার পদ্মশ্রীর যথার্থ মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ন থাকে।
​তোমার নতুন ছবির জন্য শুভকামনা রইল। হোক না তা অনৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে।”
সুমনের এই ফেসবুক পোস্ট দেখার পর ‘অভিমান’ ছবির প্রযোজকরে তরফে একটা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ”ছবির প্রযোজক হিসেবে আমরা আমাদের সমগ্র সৃজনশীল দলের সততা, মৌলিকতা এবং নিষ্ঠা নিয়ে গভীরভাবে গর্বিত। ছবিটির মূল ভাবনা যিশু সেনগুপ্তের মস্তিষ্কপ্রসূত, আর চিত্রনাট্য ও সংলাপ স্বতন্ত্রভাবে নির্মাণ ও রচনা করেছেন শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। এই ছবি তৈরির সমস্ত পদক্ষেপ আইনিভাবে নির্ভুল। আমরা সকল চলচ্চিত্র নির্মাতার কাজ এবং তাঁদের সৃজনশীল যাত্রার প্রতি সম্মান জানাই। তবে আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে ‘অভিমান’ একটি মৌলিক সৃষ্টি, যা লেখক ও নির্মাতাদের দ্বারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তৈরি হয়েছে। আমরা আমাদের চিত্রনাট্যের সততা এবং ছবিটির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের পেশাগত নৈতিকতার প্রতি দৃঢ় আস্থা রাখি। আমাদের বিশ্বাস, শিল্পকর্মের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত তার নিজস্ব গুণমান ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। আজ ‘অভিমান’ যখন প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের সামনে পৌঁছেছে, তখন আমরা দর্শক, গণমাধ্যমের সদস্য এবং সমগ্র চলচ্চিত্র জগতকে ছবিটি দেখার এবং নিজেদের বিচার-বিবেচনার ভিত্তিতে এর মূল্যায়ন করার আহ্বান জানাই।”
প্রসেনজিত্‍ চট্টোপাধ্যায় এই বিষয়ে এক বিবৃতিতে তাঁর মত স্পষ্ট করে দিলেন। তিনি সমাজ মাধ্যমে জানালেন, ”চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সুমনের প্রতি আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমাদের শিল্পে সৃজনশীল ভাবনার মধ্যে অনেক সময় মিল বা সংযোগ দেখা যায়, কারণ আমরা সকলেই মানুষের চিরপরিচিত আবেগ ও বিষয়বস্তু থেকেই অনুপ্রেরণা গ্রহণ করি। তবে ‘অভিমান’ একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আইনগতভাবে নিবন্ধিত কাজ, যা আমাদের পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এবং লেখক শ্রীজাত নির্মাণ করেছেন। একজন অভিনেতা হিসেবে আমার কাজ হলো আমাকে দেওয়া চিত্রনাট্যকে জীবন্ত করে তোলা। কারও সৃজনশীল বিশ্বাস বা আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করার কোনও উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। আমি সুমনের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করি।”
Follow Us