
রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh) যখন নন্দন চত্বরে এসে পৌঁছালেন, তখন টলিপাড়ার উত্তাপ একেবারে চরমে। বৃহস্পতিবার সকালে টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান্স স্টুডিও চত্বরে যা ঘটেছে, তাকে কোনওভাবেই ‘স্বাভাবিক’ বলা চলে না। বিজেপির তারকা বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী সংগঠনের ভোলবদলের ঘোষণা করার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই রণক্ষেত্রের রূপ নিয়েছিল স্টুডিও পাড়া। চলেছে হাতাহাতি, মুহুর্মুহু ইটবৃষ্টি আর ডিম ছোড়াছুড়ি। পরিস্থিতি সামলাতে শেষ পর্যন্ত পুলিশকে লাঠি নিয়ে ময়দানে নামতে হয়। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মাঝেই দুপুরে নন্দনে টেকনিশিয়ানদের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসলেন রুদ্রনীল ঘোষ। টেকনিশিয়ানরা তাঁদের একগুচ্ছ সমস্যার কথা চিঠির মাধ্যমে অভিনেতার হাতে তুলে দেন, যা সরাসরি পৌঁছে গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে।
সকালের এই নজিরবিহীন অশান্তি নিয়ে মুখ খুলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রুদ্রনীল। সরাসরি আক্রমণকারীদের কাঠগড়ায় তুলে তিনি টিভি ৯ বাংলাকে বলেন, “আজ সকালে যেটা হয়েছে সেটা খুব একটা আনন্দজনক নয়। টেকনিশিয়ানদের ওপরে আঘাত করেছে, ইট-পাটকেল ছুড়েছে, মানুষ আহত হয়েছেন—সেটা তো একেবারেই কাম্য নয়। তাঁরা যেই হোন না কেন, টলিউড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষ তারা হতেই পারে না।” রুদ্রনীলের ইঙ্গিত, এই ঝামেলার পিছনে কিছু বহিরাগত মানুষের হাত রয়েছে, যারা ইচ্ছা করেই টলিপাড়ার কাজের পরিবেশ নষ্ট করতে চাইছে।
ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য বুধবার। পাপিয়া অধিকারী টলিপাড়ার দীর্ঘদিনের পুরনো ফেডারেশন ভেঙে নতুন কনফেডারেশন (EIMPCC) গড়ার ডাক দেন। ২৬টি গিল্ড কমিয়ে মাত্র ৪টি বিভাগে নামিয়ে আনার কথা ঘোষণা করেন তিনি। এই খোলনলচে বদলের পরেই বৃহস্পতিবার সকালে টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে একটি বৈঠক ডাকা হলে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এক পক্ষের দাবি, বিদায়ী নেতারা নিজেদের পদ ও আখের গোছাতে বহিরাগতদের এনে নোংরামি করছেন। নন্দনে আবাসর টেকনিশিয়ানদের দাবি, বহিরাগতরা তাঁদের কটাক্ষ ছুড়ে চোর স্লোগান দিতে শুরু করেন!
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে রুদ্রনীল জানান, “রাজ্যে নতুন সরকার আসায় মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সম্মানীয় মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি টেকনিশিয়ান ভাই-বোনদের গভীর ভরসা রয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের কাছ থেকেও তাঁদের অনেক কিছু জানার ছিল। কাজ না আটকে কীভাবে সুষ্ঠুভাবে স্টুডিওর চাকা সচল রাখা যায়, তা জানতেই টেকনিশিয়ান দাদারা এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে কিছু অনভিপ্রেত সমস্যা তৈরি করা হল।” তবে রুদ্রনীলের দাবি, যাঁরা তাঁর কাছে এসেছিলেন, তাঁরা নির্দিষ্ট করে কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করেননি। টলিপাড়ার প্রত্যেকে একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে চান।
অতীতে যে কঠিন নিয়মের বেড়াজালে কাজ করতে টেকনিশিয়ানদের অসুবিধা হচ্ছিল, তার দ্রুত পরিবর্তন চাইছে সবাই। সকলেই এখন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বার্তার অপেক্ষায় রয়েছেন। রুদ্রনীল আশ্বস্ত করে বলেন, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যাশা, সবটা ঠিকঠাক মিটে যাক। যাতে কোনও রকমের অরাজকতা না হয়, স্বৈরাচারী কোনও কিছু না হয়, সেটাই দেখছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শিল্পজগৎকে ভালোবাসেন এবং তিনি এটাই চান যে সবাই একসঙ্গে আনন্দের সঙ্গে কাজ করুক।”
তিনি আরও যোগ করেন, “টেকনিশিয়ান ভাই-বোনদের যা সমস্যা হচ্ছিল, তা তারা জানিয়েছেন। সেই তথ্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়েছে। তিনি খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।” পাপিয়া অধিকারীর নির্দেশ ঘিরে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা এদিন নন্দন চত্বরে দাঁড়িয়েই বললেন টেকনিশিয়ানরা। রুদ্রনীলের কী বক্তব্য এই বিষয়ে? তিনি বলেন, ‘’এই নির্দিষ্ট ব্যাপারে বলতে পারব না। সকলেই নিজের মতো করে ভালো করার চেষ্টা করছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সম্মানীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রক। মুখ্যমন্ত্রী টলিউডের সব দিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত এবং তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের হাত ধরে দ্রুত সব সমস্যার সমাধান করা হবে’। ভবিষ্যতে যাতে এমন অশান্তি আর না হয়, তার জন্য পুলিশের সর্বোচ্চ মহলও কড়া নজরদারি শুরু করেছে, বললেন রুদ্রনীল।