
টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন শিল্পের দীর্ঘদিনের চেনা সাংগঠনিক সমীকরণ এবার বড়সড় পরিবর্তনের মুখে। গত কয়েক দশক ধরে টলিপাড়ার কর্মপরিসরে প্রভাব বিস্তার করে আসা ‘ফেডারেশন অফ সিনেমা টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’-র ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন জল্পনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই নতুন এক মঞ্চের আত্মপ্রকাশের কথা ঘোষণা করলেন টালিগঞ্জের নবনির্বাচিত বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। টেকনিশিয়ান স্টুডিও প্রাঙ্গণে তিনি জানান, পুরনো পরিকাঠামোকে পিছনে ফেলে এবার ইন্ডাস্ট্রি এগোতে চলেছে সম্পূর্ণ নতুন একটি সংগঠন, ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশান পিকচার্স অ্যান্ড কালচারাল কনফেডারেশন’ বা ‘EIMPCC’-র হাত ধরে। আগের সংগঠনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে একাধিপত্য ও একচ্ছত্র দাপটের যে সমস্ত অভিযোগ উঠছিল, এই নতুন ঘোষণার ফলে সেই চেনা খোলনলচে বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই মনে করছেন পাপিয়া।
উপস্থিত শিল্পী, কলাকুশলী এবং কর্মীদের সামনে পাপিয়া অধিকারী জানান, আগামী পরশু থেকেই নতুন ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন গিল্ডকে একত্রিত করার প্রক্রিয়াটি শুরু করা হবে। তাঁর দাবি, বাংলা বিনোদন জগতকে আরও সুসংগঠিত, স্বচ্ছ এবং কর্মমুখী করে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতদিন টলিউডে ২৬টি আলাদা আলাদা গিল্ড ছিল। এবার এক ঝটকায় কমিয়ে আনা হল মাত্র ৪টি বিভাগে। পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার (ক্যামেরা), প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং আর্ট ও কস্টিউম, এই চার মাথার অধীনেই এবার নিয়ন্ত্রিত হবে গোটা টলিপাড়া। প্রতি বিভাগে থাকবেন দু’জন করে কোঅর্ডিনেটর। পাপিয়ার সাফ কথা, “এতদিন টাকা দিয়ে অনেক অযোগ্য মানুষ পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন। যোগ্য টেকনিশিয়ানরা কাজ পাচ্ছিলেন না। তাই এবার কাজের অধিকার পেতে গেলে ‘SIR’ (স্ক্রিনিং বা সিলেকশন)-এর কড়া নিয়মের মুখোমুখি হতে হবে সবাইকে।” এই বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা, “টলিউডে এবার ‘SIR’, যোগ্যরাই কাজ পাবেন।”
পাপিয়া বলেছেন যে নতুন এই কনফেডারেশনের মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা বদল নয়, বরং টলিপাড়ার অন্দরের দমবন্ধ করা ‘ব্যান কালচার’ এবং ‘সাসপেনশন কালচার’কে চিরতরে উপড়ে ফেলা। তাঁর মতে বিগত চার-পাঁচ মাসে টলিউডে একটি ছবিও ঠিকঠাকভাবে তৈরি হতে পারেনি, যার জেরে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রযোজকেরা। এই প্রসঙ্গে পাপিয়ার ক্ষোভ, “গত চার-পাঁচ মাসে একটাও ছবি ঠিকঠাক হয়নি।” এই অচলাবস্থা কাটাতেই সাত দফার এক মাস্টারপ্ল্যান আনা হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হল, সমস্ত টেকনিশিয়ানদের কাজের সময়সীমা ও সাম্মানিক নির্দিষ্ট করা, অবহেলিত কর্মীদের কাজের অধিকার সুনিশ্চিত করা, কলাকুশলী ও তাঁদের পরিবারের জন্য চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা এবং সর্বোপরি টালিগঞ্জকে একটি বিশ্বমানের ফিল্ম সিটি হিসেবে গড়ে তোলা। এখানেই শেষ নয়, আগের ফেডারেশনের জমানায় কী কী আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখে সরাসরি রাজ্য সরকারকে রিপোর্ট পাঠাবে এই নতুন বোর্ড।
টলিপাড়ার ক্ষমতা হস্তান্তরের এই আবহে অবধারিতভাবেই উঠে এসেছে স্বরূপ বিশ্বাসের নাম। তবে টালিগঞ্জে ‘বিশ্বাসের ভাইদের’ ভূমিকা যে আর থাকছে না, তা পাপিয়ার কথাতেই পরিষ্কার। দুর্নীতির পাহাড় জমে থাকা সত্ত্বেও কেন এখনও কেউ শ্রীঘরে যাননি? এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রী জানান, তাঁর মধ্যে একটি “মাতৃত্বসুলভ ব্যাপার আছে”, নইলে এতদিন যা অভিযোগ এসেছে, তাতে অনেকেরই গ্রেপ্তার হওয়ার কথা ছিল। যাঁরা এতদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে শোষণ চালিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশে তাঁর কড়া বার্তা, “যাঁরা এতদিন ধরে এত শোষণ করেছেন, কাজ দেননি, তাঁরা নিজেরাই এবার সরে যান।” বহিরাগতদের কারণে স্থানীয় কলাকুশলীদের রুজি-রোজগার নষ্ট হওয়া নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি। স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এর “দায়িত্ব নেবে প্রশাসন।” সমস্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানে সপ্তাহে তিন দিন বসবে বিশেষ আলোচনা সভা। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টে এবং কাজের চাপে যাঁরা সকালের দিকে আসতে পারবেন না, তাঁদের জন্য বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এই কনফেডারেশনের দরজা। সব মিলিয়ে, টলিউডে এক নতুন ভোরের সূচনা হতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।