India RTI movement: দিল্লি নয়, কুঁড়েঘর থেকে শুরু হওয়া একটি আইন

India’s Right to Information Movement: একটি জাতীয় আইন কীভাবে শুরু হয়? আজকের ‘YOUR INDIA’ কলামে সন্তোষ নায়ার ফিরে দেখছেন রাজস্থানের দেবদুংরি, জন শুনানি এবং সেই আন্দোলনের কথা, যা একটি সহজ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল—যদি সরকারি টাকা খরচ করা হয়, তাহলে সেই টাকার হিসাব-নিকাশের নথি সাধারণ মানুষকে দেখতে দেওয়া হবে না কেন?

India RTI movement: দিল্লি নয়, কুঁড়েঘর থেকে শুরু হওয়া একটি আইন
একটি আইন আসলে কোথা থেকে শুরু হয়?

| Edited By: সঞ্জয় পাইকার

Oct 02, 2026 | 10:24 PM

নয়াদিল্লি: রাজস্থানের ছোট্ট একটি গ্রাম দেবদুংরিতে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল মাটি আর পাথরে তৈরি একটি সাধারণ কুঁড়েঘর। এক-দু’টি ঘর। এর বেশি কিছু নয়। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় কয়েকজন মানুষ সেখানে থাকতেন এবং কাজ করতেন। তাঁদের চারপাশে ছিলেন গ্রামের এমন মানুষ, যাঁরা সরকারি ত্রাণ প্রকল্পে কঠিন পরিশ্রম করতেন—কেউ কুয়ো খুঁড়তেন, কেউ রাস্তা তৈরি করতেন, কেউ জমি পরিষ্কার করতেন। এই কাজের বিনিময়ে তাঁদের মজুরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনেক সময় সেই পুরো টাকা তাঁদের হাতে পৌঁছত না।

তাঁদের সন্দেহ ছিল, সরকারি দফতর থেকে তাঁদের হাতে টাকা পৌঁছনোর মাঝখানে কোথাও নথিপত্রে কারচুপি হচ্ছে। কিন্তু তা যাচাই করার কোনও উপায় তাঁদের ছিল না। তাঁদের নিজেদের শ্রম, নিজেদের মজুরি সংক্রান্ত যে নথি, সেই কাগজপত্র পড়ে থাকত এমন এক সরকারি দফতরে, যেখানে তাঁদের ঢোকারই অনুমতি ছিল না।

জন শুনানি শুরু হল এক সহজ দাবিতে-

তাই ওই কুঁড়েঘরে থাকা মানুষজন এবং গ্রামের বাসিন্দারা মিলে এমন একটি কাজ করলেন, যা শুনতে প্রায় অবিশ্বাস্য রকম সহজ। তাঁরা সরকারি আধিকারিকদের কাছে হিসাবের খাতাগুলি প্রকাশ্যে আনার দাবি জানালেন। তারপর সেই নথিগুলি গ্রামের মানুষের সামনে, প্রকাশ্য জায়গায় পড়ে শোনানো শুরু হল। যে মানুষদের নিয়ে ওই নথি তৈরি, তাঁদের সামনেই।

কোনও খাতায় যদি লেখা থাকত যে একটি রাস্তা তৈরি হয়েছে, তাহলে সেই রাস্তার বাসিন্দারা উঠে দাঁড়িয়ে বলতে পারতেন, সত্যিই রাস্তা তৈরি হয়েছে কি না। নথিতে যদি লেখা থাকত কোনও শ্রমিককে মজুরি দেওয়া হয়েছে, সেই শ্রমিক নিজেই বলতে পারতেন, তিনি সত্যিই টাকা পেয়েছেন কি না।

এই সভাগুলির নাম দেওয়া হয়েছিল জন শুনানি—অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ্য শুনানি।

প্রথম জন শুনানি হয়েছিল ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে, কোট কিরানা নামে একটি গ্রামে। এরপর আরও অনেক জন শুনানি হয়। আর বারবার সেখানে যে ছবি সামনে আসতে থাকে, তা ছিল সহজ কিন্তু গুরুতর। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ টাকা এমন সব সরকারি নথির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিল, যেগুলি সরকারি দফতরের বাইরে কাউকে দেখার সুযোগই দেওয়া হত না।

সেখান থেকেই আরও জোরালো হয়ে উঠল একটি প্রশ্ন—যদি এটা সাধারণ মানুষের টাকা হয়, তাহলে সেই টাকা কোথায় গেল, তা সাধারণ মানুষ দেখতে পারবে না কেন? প্রশ্নটি আর শুধু রাজস্থানের মধ্যে আটকে থাকল না। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে একের পর এক রাজ্য নিজেদের তথ্য জানার অধিকার সংক্রান্ত আইন তৈরি করতে শুরু করল। বছরের পর বছর দাবি আরও জোরালো হতে থাকল। অবশেষে ২০০৫ সালে সংসদে পাশ হল জাতীয় তথ্য জানার অধিকার আইন (Right to Information Act)।

এই আইনই এখন দেশের নাগরিকদের সরকারি দফতরের কাছে তথ্য চাওয়ার অধিকার দেয়। কোনও ভারতীয় নাগরিক সরকারি দফতরের নথি দেখতে চাইতে পারেন এবং সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে সেই আবেদনের উত্তর পাওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে।

আজ যে আইন দেশের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের প্রশ্ন করার অধিকারকে সুরক্ষিত করে, তার শুরু হয়েছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি ছোট কুঁড়েঘরে বসে কয়েকজন গ্রামবাসীর এই দাবি থেকে—সরকারি হিসাবের খাতাগুলি পড়ে শোনানো হোক।

একটি আইন আসলে কোথা থেকে শুরু হয়?

এই ঘটনাটি নিয়ে একটু ভাবা যায়। কারণ এর মধ্যে এমন একটি প্রশ্নের উত্তর রয়েছে, যা আমরা সাধারণত থেমে ভাবি না—একটি আইন আসলে কোথা থেকে শুরু হয়?

সংসদ থেকে নয়। সংসদে সাধারণত একটি আইন পৌঁছয় তার যাত্রার প্রায় শেষ পর্যায়ে। সেখানে সেটি নিয়ে আলোচনা হয়, বিতর্ক হয়, ভোটাভুটি হয়। তার আগে একটি আইন সাধারণত জন্ম নেয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোনও সমস্যা থেকে—যে সমস্যা বারবার সামনে আসে এবং শেষ পর্যন্ত আর উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না।

কখনও কোনও আদালত এমন একটি সমস্যা দেখতে পায়, যার সমাধান কোনও প্রচলিত আইনে নেই। কখনও কোনও সরকারি দফতর নিজেই কোনও বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। আবার কখনও, তথ্য জানার অধিকার আইনের মতো, কোনও ছোট গ্রামের কয়েকজন মানুষ এমন একটি প্রশ্ন করতে থাকেন, যার উত্তর না দিয়ে আর থাকা সম্ভব হয় না।

সেখান থেকে সাধারণত প্রক্রিয়াটি এগোয় এইভাবে। প্রথমে ভাবনাটি একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের আকার পায়। কোনও মন্ত্রক সেটিকে একটি বিলের খসড়ায় পরিণত করে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সংসদে সেই বিল পেশ করার অনুমোদন দেয়। এরপর সংসদে শুরু হয় আলোচনা, বিতর্ক ও ভোটাভুটি। পথে বিলটিতে পরিবর্তনও আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটিই আইনে পরিণত হয়ে গোটা দেশে কার্যকর হয়।

কিন্তু আসল শুরুটা, সেই বীজটা, সাধারণত রাজধানীর কোনও বিশাল ভবনে তৈরি হয় না। তা তৈরি হয় আরও ছোট, আরও নীরব এবং মানুষের জীবনের আরও কাছাকাছি কোনও জায়গায়।

কীভাবে স্থানীয় একটি প্রশ্ন জাতীয় অধিকারে পরিণত হল-

এক কোণে জ্বালানো একটি ছোট প্রদীপও কখনও কখনও বিশাল একটি ঘর আলোকিত করতে পারে। দেবদুংরির মানুষ যখন সেই প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, তখন তাঁরা আইন তৈরির কথা ভাবেননি। তাঁরা শুধু নিজেদের প্রাপ্য মজুরির হিসাবটা পরিষ্কারভাবে জানতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু অনেক সময় এভাবেই পরিবর্তনের শুরু হয়।

একবার নিজের জীবনের কথাও ভাবুন। এমন কোনও বিষয়, যা আপনার কাছে অন্যায়, অস্পষ্ট বা নিছক ভুল বলে মনে হয়েছে। এমন কোনও নথি, যা আপনাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। এমন কোনও নিয়ম, যার ব্যাখ্যা কখনও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়নি। অথবা এমন কোনও নীরবতা, যেখানে আসলে একটি উত্তর থাকা উচিত ছিল।

রাজস্থানের কোথাও একসময় একদল মানুষ ঠিক এমনই এক নীরবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা শুধু একটি কাজ করেছিলেন—প্রকাশ্যে, জোরে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কাগজগুলো পড়ে শোনানো হোক।

লেগেছিল এক দশকেরও বেশি সময়।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর এসেছিল।

আর সেই প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয়েছিল একটি জাতীয় অধিকার।

সূত্র: তথ্য জানার অধিকার আইন, ২০০৫ (ভারতীয় সংসদ); মজদুর কিষান শক্তি সংগঠন (MKSS)-এর সরকারি ইতিহাস, mkssindia.org; ব্রিটানিকা, ‘অরুণা রায়’; দ্য বেটার ইন্ডিয়া,  “How One Rajasthan Village Gave India the Right to Information Act.”।

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us