
নয়া দিল্লি: একের পর এক দেশের মধ্যে যুদ্ধ, বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা থামছেই না। আর সেই কারণেই ক্রমাগত বাড়ছে জ্বালানির দাম। পেট্রোল-ডিজেলের দাম লাগাতার বেড়েই চলেছে। এই আবহেই কেন্দ্রের বড় পদক্ষেপ। শুক্রবার, ৫ জুন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন ই-৮৫ জ্বালানির (E-85 Fuel)। কী এই ই-৮৫? আপনার গাড়িতে কী এই জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে? জেনে নিন নতুন এই জ্বালানির খুঁটিনাটি।
ইথানল ব্লেন্ডিং (Ethanol Blending) হল পেট্রোলের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে ইথানল মিশ্রিত করার প্রক্রিয়া। এক ধরনের জৈব অ্যালকোহল হল ইথানল। মূলত আখের রস, ভুট্টা বা ধানের তুষের মতো জৈববস্তু থেকে এই ইথানল তৈরি করা হয়। বর্তমানে অনেক দেশেই পেট্রোলে ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানো হয়। এর অনেক সুবিধা আছে-
ইথানলে পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকায় এটি জ্বালানির সম্পূর্ণ দহনে সাহায্য করে, ফলে কার্বন মনোক্সাইড এবং বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন অনেক কমে যায়।
ইথানল পেট্রোলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা, যা জ্বালানির মোট খরচ কমাতে সাহায্য করে।
দেশে উৎপাদিত জৈব জ্বালানি ব্যবহারের ফলে অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে।
কৃষিজাত পণ্য থেকে ইথানল তৈরি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হন অনেকটাই।
বাজারে আগে থেকেই ছিল ই-২০। এতে ৮০ শতাংশ পেট্রোল এবং বাকি ২০ শতাংশ ইথানল ব্লেন্ডেড জ্বালানি থাকত। একইভাবে ই-৮৫ এ ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ইথানল থাকবে, বাকি ১৪ থেকে ১৯ শতাংশ পেট্রোল থাকবে। এর দামও পেট্রোল-ডিজেলের তুলনায় অনেকটা কম। দিল্লিতে ই৮৫-র দাম লিটার প্রতি ৮২.১২ টাকা, যা ই২০ পেট্রোলের তুলনায় ২০ টাকা সস্তা।
ভারতে বর্তমানে গাড়িগুলি পেট্রোল, ডিজেল, সিএনজি ও ইথানল ব্লেন্ডিং পেট্রোল ব্যবহার করা হয়। এলপিজি ও বায়ো-ডিজেল খুব একটা গাড়িতে ব্যবহার হয় না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন, আপাতত দেশের পাবলিক সেক্টর অয়েল মার্কেটিং কোম্পানিগুলির ৪৮টি রিটেল আউটলেটে এই জ্বালানি পাওয়া যাবে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংখ্যা ৫০০-এ এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০০০ আউটলেটে ই-৮৫ জ্বালানি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রের।
ব্রাজিলে প্রায় এক দশক ধরে ইথানল ব্লেন্ডিং ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে সে দেশের ৮০ শতাংশ লাইট ভেহিকেল বা গাড়িই ফ্লেক্স ফুয়েল টেকনোলজিতে চলে। ভারতেও ই২০ চালু হওয়ার পর ইঞ্জিন ফেলিওর বা গাড়ির ব্রেকডাউন হওয়ার অভিযোগ আসেনি ইথানল ব্লেন্ডিংয়ের কারণে।
এবার সবথেকে বড় প্রশ্ন হল, সব গাড়িতে কি ই৮৫ জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে? সহজ কথায় উত্তরটা হল, না। এই জ্বালানি আপাতত শুধুমাত্র ফ্লেক্স ফুয়েল গাড়িতেই (Flex Fuel Vehicles) ব্যবহার করা যাবে। অন্য গাড়িতে এই পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে না। যাতে গাড়িচালকদের মধ্যে কোনও সংশয় তৈরি না হয়, তার জন্য পেট্রোল পাম্পগুলিতে আলাদা করে ব্রান্ডিং ও লেবেল থাকবে।
ইথানল ব্লেন্ডিংয়ে জ্বালানি তৈরি হলেও, যে গাড়ি বা বাইকে ই-২০ ব্যবহার হয়, সেই গাড়িতে ই-৮৫ ব্যবহার করা যাবে না। যে গাড়িগুলি ই-২০ জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, তা শুধুমাত্র ই-২০ জ্বালানিতেই চলবে। ই-৮৫ জ্বালানিতে ৮৫ শতাংশ ইথানল থাকে। যদি ই-২০ গাড়িতে ই-৮৫ জ্বালানি ভরা হয়, তাহলে নানা সমস্যা হতে পারে। ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স কমে যাওয়া থেকে শুরু করে ফুয়েল সিস্টেম ড্য়ামেজ, জং পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে যা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার রূপও নিতে পারে। ৮৫ শতাংশ ইথানল ব্লেন্ডিং জ্বালানি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ইঞ্জিন ক্যালিব্রেশনের প্রয়োজন, যা ই-২০ গাড়িতে থাকে না।
ফ্লেক্স ফুয়েল ভেহিকেলেই একমাত্র এই জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে। এই গাড়িগুলি ইথানল-পেট্রোল ব্লেন্ডের বিভিন্ন রেঞ্জের জ্বালানি ব্যবহার করা যায়। ই-২০ থেকে শুরু করে ই-৮৫, এমনকী ই-১০০-ও ব্যবহার করা যায়। এই গাড়িতে ইথানল রেজিস্টেন্ট কম্পোনেন্ট ও ফুয়েল ম্যাপিং ব্যবহার করা হয়, যার ফলে ইথানল ব্লেন্ড ব্যবহার করলেও ইঞ্জিনের কোনও ক্ষতি হয় না।
এর সবথেকে বড় সুবিধা হল ফ্লেক্সিবিলিটি। গাড়ি মালিকরা যেমন সাধারণ পেট্রোল ব্যবহার করতে পারেন, তেমন প্রয়োজন হলে হাই ইথানল ব্লেন্ডও ব্যবহার করতে পারেন।
ফ্লেক্স ফুয়েল ভেহিকেলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ৬১ শতাংশ কম হয় বাকি সাধারণ গাড়ির তুলনায়। দূষণ কম হয় এই গাড়িতে। যেখানে ভারতে বায়ুদূষণ বড় সমস্যা হয়ে দাড়াচ্ছে, সেখানে এই জ্বালানি দূষণ প্রতিরোধে অনেকটাই সাহায্য করতে পারে।