
নয়া দিল্লি: এল নিনো (El Nino)-র প্রভাবে তীব্র গরম সহ্য করতে হয়েছে। এবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবার চরম সতর্কতা জারি করল এল নিনো নিয়ে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যেও প্রভাব পড়তে চলেছে। এখানে আবার ভারতকে উচ্চ থেকে উচ্চতর ঝুঁকি (High to Very High Risk) পর্যায়ে রেখেছে হু (WHO)। অর্থাৎ এল নিনোর প্রভাবে ভারতীয়দের স্বাস্থ্যেও নানা ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে চলেছে। এমনকী, প্রাণহানিও হতে পারে। কী এমন হতে চলেছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন, হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ, হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ধরন বা প্যাটার্নে পরিবর্তন হয়েছে। এর জেরে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। মশা বাহিত রোগ, যেমন ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ক্রমশ বাড়ছে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা গরমের কারণে নানা ধরনের অসুস্থতাও বাড়ছে।
যেমন দিল্লিতে গত অগস্ট মাসে নতুুন করে ৯০ জন ডেঙ্গি আক্রান্তের খোঁজ মিলেছে। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা এক মাসেই তিনগুণ বেড়েছে। কলকাতাতেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০০-রও বেশি ডেঙ্গি আক্রান্তের খোঁজ মিলেছে। রাজ্যে সেই সংখ্যাটা সাড়ে চার হাজারেরও বেশি।
তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি মশার বংশবৃদ্ধিও বাড়ছে। যদি মশাবাহিত রোগের প্রকোপ ব্যাপক হারে বাড়ে, তাহলে মধ্য ও উত্তর ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হবে।
এল নিনো হল একটি জলবায়ুগত পরিস্থিতি, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ায়। ভারতে এর প্রভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত কম হওয়া, স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা এবং অনিয়মিত বর্ষা দেখা যেতে পারে। খরারও সৃষ্টি হয়। এই পরিবর্তিত আবহাওয়া জনস্বাস্থ্যের উপর মূলত দু’ভাবে প্রভাব ফেলে।
তাপমাত্রা বাড়লে এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) মশার শরীরে ডেঙ্গি ভাইরাসের (DENV) বিকাশ (incubation) প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। অন্যদিকে, অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে শহরের নিকাশি নালা, এয়ার কুলার এবং বাড়িতে জল জমিয়ে রাখার পাত্রে জল জমে থাকে। এই জমা জল মশার বংশবিস্তারের আদর্শ জায়গা তৈরি করে।
বর্ষার শেষ দিকে শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা যুক্ত হলে হিট এক্সহস্টশন, হিটস্ট্রোক এবং অতিরিক্ত গরমজনিত শারীরিক সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসযন্ত্র বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এল নিনোর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক তাপমাত্রা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মশাবাহিত রোগ ছড়ানোর স্বাভাবিক মৌসুমি পরিস্থিতিকেও বদলে দিচ্ছে। শহরগুলিতে যখন অস্বাভাবিক আর্দ্রতার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম চলতে থাকে, তখন মশার বংশবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে মশা আরও ঘনঘন কামড়াতে পারে এবং মশার শরীরে ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড (incubation period) বা বিকাশের সময় কমে যায়।
ভারতের জনবহুল বড় শহরগুলিতে গড় তাপমাত্রা মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলেও, বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা অল্প জলে দ্রুত মশার বংশবিস্তার হতে পারে। এর ফলে ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনোর প্রভাবে দিল্লি, মহারাষ্ট্রে ডেঙ্গির প্রকোপ ব্যাপক হারে বেড়েছে। অন্যদিকে, দিনমজুর বা শ্রমিকরা, যারা রোদে-জলে খাটুনি করেন, অতিরিক্ত গরমে চরম ক্লান্তিভাব, ডিহাইড্রেশন, অ্যাকিউট মেটাবলিক কমপ্লিকেশনের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মূলত গর্ভবতী, নবজাতক, প্রসূতি ও প্রবীণ নাগরিকদের ঝুঁকি সবথেকে বেশি।