
নয়া দিল্লি: ভারত বৈচিত্র্যময় দেশ। বিস্ময়কর দেশও বটে। আচ্ছা, কখনও মনে এমন প্রশ্ন এসেছে যে আমাদের দেশ ভারত কত বড়? ভারতে একটি ট্রেন রয়েছে। যা একটানা চলেও দেশের শেষ প্রান্তে পৌঁছোতে লাগে তিনদিন। অসমের ডিব্রুগড় স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে বিবেক এক্সপ্রেস। প্রায় ৪,২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় এই ট্রেন। আটটি রাজ্য অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত পৌঁছয় দেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত কন্যাকুমারীতে। তাহলে আদতে কত বড় ভারত?
জনসংখ্যার হিসেবে ভারতের বিশালত্ব বোঝা যেতে পারে। ভারতের আয়তন প্রায় ৩২.৯ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। এই ভূখণ্ডে বসবাস করেন ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষ। তবে বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ঠিক কত, তার সরকারি হিসেব নেই। কারণ, ভারতে শেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। তবে, চলতি বছর ফের জনগণনা হচ্ছে দেশজুড়ে।
জনসংখ্যার হিসেবে গোটা দেশের হিসাব বাদ দিয়ে শুধু একটি রাজ্যের দিকেই নজর দেওয়া যাক। জানেন কি উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনের সম্মিলিত জনসংখ্যার থেকেও বেশি। আর দেশে তো মোট ২৮টি রাজ্য। তার মধ্যে একটি রাজ্য উত্তরপ্রদেশ। এর সঙ্গে রয়েছে ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ভাবতে পারছেন কতটা বড় এই দেশ? হিমবাহ থেকে মরুভূমি, ঘন অরণ্য থেকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল…ভারতের ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর।
ভারতের বিশালত্ব বোঝার আরও একটি উপায় রয়েছে। তার সঙ্গে জনসংখ্যার কোনও সম্পর্ক নেই। পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভারত এতটাই বিস্তৃত যে অরুণাচল প্রদেশে যখন সূর্য ওঠে, তখন গুজরাটের অনেক জায়গায় অন্ধকার থাকতে পারে। সূর্যের সময়ের হিসাবে দুই প্রান্তের মধ্যে ব্যবধান প্রায় দুই ঘণ্টা। বিশ্বের অনেক বড় দেশ এই সমস্যার সমাধানে একাধিক টাইম জ়োন ব্যবহার করে। রাশিয়ায় ১১টি টাইম জ়োন রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে একাধিক টাইম জ়োন। কিন্তু ভারত সচেতনভাবেই একটি স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুসরণ করে। ফলে অসমের চা-বাগানের কোনও শ্রমিক এবং কচ্ছের কোনও কৃষক একই ঘড়িতে সময় দেখেন।
ভারতের বিশালত্ব বুঝতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও তুলনা করা যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আয়তন ভারতের থেকে বেশি হলেও সেখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ভারতের তুলনায় অনেক কম। ইউরোপকে আমাদের বিশাল বলে মনে হয়, কারণ সেই ভূখণ্ডকে আমরা অনেকগুলি আলাদা দেশের সমষ্টি হিসেবে দেখি। অন্যদিকে, বিপুল জনসংখ্যা ও অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্যকে ভারত একটি দেশের সীমানার মধ্যেই ধারণ করে রেখেছে।
শুধু জনসংখ্যার হিসেবে নয়, দেশের এক প্রান্তের একজন নাগরিকের সকাল আর অন্য প্রান্তের আর একজন নাগরিকের সকালের মধ্যে যে বিপুল পার্থক্য, সেই দূরত্বের মধ্যেও রয়েছে ভারতের আসল ব্যাপ্তি। এই দূরত্ব বা বৈচিত্র্য কোনও দুর্বলতা নয়। বরং সেটাই ভারতের বাস্তব চরিত্র।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কন্যাকুমারীতে পৌঁছয় বিবেক এক্সপ্রেস। যাত্রীরা ট্রেন থেকে নেমে দাঁড়ান দেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে। একটি দেশের মধ্যেই তাঁরা তিন দিনেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার কিলোমিটার সফর করেছেন। আমাদের অধিকাংশই হয়তো কোনওদিন ডিব্রুগড় থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত এই গোটা ট্রেনযাত্রা করব না। কিন্তু একবার ভারতের মানচিত্রে আঙুল দিয়ে বিবেক এক্সপ্রেসের পথটা অনুসরণ করা যেতেই পারে। উত্তর-পূর্বের ডিব্রুগড় থেকে একেবারে দক্ষিণের কন্যাকুমারী পর্যন্ত। তাহলেই হয়তো কিছুটা অনুভব করা যাবে, ভারত আসলে কতটা বড়। আর সেই বিশালত্ব বুঝে নেওয়ার পর সামনে আসে আরও বড় একটি প্রশ্ন। আমরা যখন বলি, ‘ভারত চায়’, ‘ভারত বিশ্বাস করে’ কিংবা ‘ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে’—তখন আসলে কোন ভারতের কথা বলছি? কার ভারতের কথা বলছি?