
প্রায় ৬০ বছর আগে একটি সরকারি কমিশন খতিয়ে দেখেছিল, আমেরিকা, জাপান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দেশগুলি শিক্ষাখাতে কতটা ব্যয় করে। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে কমিশনের সিদ্ধান্ত ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উন্নয়নশীল দেশ সত্যিই চিন্তিত, তাদের শিক্ষাখাতে অন্তত জিডিপির ৬ শতাংশ খরচ করা উচিত। ষাটের দশকে কোঠারি কমিশন এই সুপারিশ করেছিল। তারপর থেকে ভারতের শিক্ষা সংক্রান্ত নীতিপত্রে বারবার এই লক্ষ্যমাত্রার উল্লেখ করা হয়েছে। কার্যত তা যেন একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ভারত আজও এই লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি।
কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে শিক্ষাখাতে ভারতের মোট ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র ২.৭ শতাংশ। কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেই এই তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়টি কোনও একটি বছরের সাময়িক ঘাটতি নয়। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, শিক্ষাখাতে ব্যয়ের হার ২.৭ থেকে ২.৯ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছে। অর্থাৎ বছরের পর বছর প্রায় একই জায়গায় আটকে রয়েছে এই বরাদ্দ। কয়েক বছরে তা কমেছেও। শুধু টাকার অঙ্কের নিরিখে নয়, প্রকৃত বাজেটের অংশ হিসেবে হিসাব করলে শিক্ষাখাতে ব্যয়ের সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী বলেই উল্লেখ করেছে অর্থনৈতিক সমীক্ষা। সামাজিক পরিষেবা খাতে মোট বাজেটের মধ্যে শিক্ষার অংশও কমেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে এই হার ছিল ১০.৭ শতাংশ, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তা কমে প্রায় ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কেন এই শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ?
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, টাকার অঙ্কে শিক্ষাখাতে ভারতের ব্যয় কমেছে। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি যথেষ্ট বড় হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে শিক্ষাখাতের বাজেটও। কিন্তু জিডিপি বেড়েছে আরও দ্রুত গতিতে। আর সেই কারণেই দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের কতটা অংশ শিশুদের শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে, সেই শতাংশের হিসাব গত প্রায় এক দশক ধরে কার্যত একই জায়গায় আটকে রয়েছে। অথচ শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন শিশুর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে তাদের শিক্ষার চাহিদা ও পাঠ্যক্রমের জটিলতা।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্কুলের একটি শ্রেণিকক্ষে, এমনকী একজন পড়ুয়ার উপরেও। জিডিপির তুলনায় শিক্ষাখাতে কম ব্যয়ের অর্থ হল, স্কুলে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আগেই উঠে এসেছে, সারা দেশে প্রায় ৩.৫৭ লক্ষ শিক্ষকের পদ খালি পড়ে রয়েছে। বহু স্কুলে কার্যকর শৌচাগার নেই, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব রয়েছে এবং পরিকাঠামো সংক্রান্ত ন্যূনতম নিয়মও মানা হচ্ছে না। জাতীয় স্তরে পড়ুয়া ও শিক্ষকের অনুপাত সন্তোষজনক মনে হলেও, নির্দিষ্ট কিছু জেলায় পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সেখানে শ্রেণিকক্ষে পড়ুয়ার সংখ্যা অনেক বেশি।
এই সমস্যাগুলি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং শিক্ষাখাতে এমন একটি বাজেট, যা প্রয়োজনের তুলনায় বাড়েনি এবং কোঠারি কমিশনের ছয় দশক আগের সুপারিশও পূরণ করতে পারেনি, তারই পরিণতি এই ঘাটতিগুলি।
অন্য দেশগুলি কীভাবে এগিয়েছে?
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তুলনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা পাওয়া যায়। দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলির উদাহরণ প্রায়ই সামনে আসে। এই দেশগুলি শক্তিশালী এবং তুলনামূলকভাবে সমান সুযোগসম্পন্ন স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় ধরে জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশেরও বেশি অর্থ শিক্ষাখাতে ব্যয় করেছে। বিশেষ করে যখন তারা সর্বজনীন স্কুল পরিকাঠামো তৈরি এবং শিক্ষকদের গুণগত মান উন্নত করার কাজ করছিল, তখনই এই বিনিয়োগ করা হয়েছিল। ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পরে নয়।
ভারতও কার্যত একই ধরনের লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চাইছে। দেশের ২৫ কোটিরও বেশি শিশুর জন্য সর্বজনীন ও উন্নত মানের স্কুলশিক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় এই বিপুল দায়িত্ব পালনের জন্য যে আর্থিক ভিত্তি প্রয়োজন, ভারতের বাজেট তার তুলনায় অনেকটাই দুর্বল।
শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না-
এতদিনের এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শিক্ষকের শূন্যপদ, প্রাথমিক স্তরে পড়াশোনার মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি, স্কুলছুটের হার বৃদ্ধি এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার সঙ্গে অন্যান্য মাধ্যমের শিক্ষার টানাপোড়েনের মতো একাধিক সমস্যা। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই এই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা বলা সরলীকরণ হবে। কারণ, সঠিকভাবে খরচ না হলে অতিরিক্ত অর্থ দিয়েও খুব বেশি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
তবে এটাও ঠিক যে, শিশুদের শিক্ষার জন্য দেশের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে এবং উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়ালে এই সমস্যাগুলির কার্যকর সমাধান আশা করা কঠিন। অনুমোদিত শিক্ষকের পদে নিয়োগ, উন্নত স্কুল পরিকাঠামো, কার্যকর শৌচাগার তৈরি কিংবা মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলিকে আরও কাছে নিয়ে আসা—প্রতিটি পদক্ষেপের জন্যই অর্থের প্রয়োজন। আর সেই অর্থের সংস্থান করতে হবে কোনও না কোনও বাজেট থেকেই।
জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ হলে কী কী সম্ভব?
কোঠারি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা সত্যিই পূরণ করা গেলে কী কী পরিবর্তন সম্ভব, তা একবার ভেবে দেখা যাক। বর্তমান ব্যয়ের তুলনায় এই বরাদ্দ হবে দ্বিগুণেরও বেশি।
এই অর্থ দিয়ে দেশের সমস্ত শূন্য শিক্ষকপদে একাধিকবার নিয়োগ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তৈরি হতে পারে। বর্তমানে যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ স্কুলে ন্যূনতম পরিকাঠামোগত মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না, সেগুলির শৌচাগার ও অন্যান্য পরিকাঠামো সম্পূর্ণ আধুনিক করে তোলাও সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিশুদের প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনার মৌলিক দক্ষতা বাড়ানোর কর্মসূচিও জাতীয় স্তরে আরও বড় পরিসরে চালানো যেতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন রাজ্যে বিচ্ছিন্নভাবে যে উদ্যোগগুলি চলছে, সেগুলিকে আরও সুসংহত করা সম্ভব হবে।
নাগরিকদের নজর রাখা উচিত কোন পরিসংখ্যানে?
একজন নাগরিকের পক্ষে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের প্রতিটি শতাংশ মনে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং কেন্দ্র বা রাজ্যের বাজেট ঘোষণার সময় একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—মোট বাজেটের মধ্যে শিক্ষাখাতের অংশ বাড়ছে, একই জায়গায় থাকছে, নাকি নীরবে কমে যাচ্ছে?
আর সেই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা দরকার, কেন এমনটা হচ্ছে? কারণ, এই একটি সংখ্যার উপরই নির্ভর করে দেশের স্কুলগুলির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার যে সমস্যাগুলি উঠে এসেছে, সেগুলির অনেক কিছুর সঙ্গেই সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয়ের এই হিসাব।
সূত্র: ভারতের অর্থনৈতিক সমীক্ষা, অর্থ মন্ত্রক—২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত জিডিপির অংশ হিসেবে শিক্ষাখাতে ব্যয়ের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান; কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬)-এর শিক্ষাখাতে ব্যয় সংক্রান্ত সুপারিশ; জিডিপির অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাখাতে ব্যয়ের তুলনামূলক তথ্য।