
নয়াদিল্লি: অবশেষে হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল দেশের শীর্ষ আদালত। এমন ঘটনা দেশে এই প্রথমবার। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট সায় দিল গাজ়িয়াবাদের হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যুতে। এবার খুলে দেওয়া হবে জীবনদায়ী ব্যবস্থা। যা এতদিন ধরে কৃত্রিম ভাবে বন্দি করে রেখে ছিল হরীশের প্রাণকে।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং কেভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলার রায় দিয়েছে। হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর রায় দিতে গিয়ে বিচারপতির বেঞ্চ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর একটি লাইনও উল্লেখ করে — ‘টু বি অর নট টু বি’। আদালত জানায়, ভারতে প্রত্যক্ষ মৃত্যু বা অ্যাকটিভ ইউথানেশিয়া সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ। তবে হরীশের ক্ষেত্রে সেই মৃত্যু প্রযোজ্য হচ্ছে না। তাই তাঁর পরোক্ষ মৃত্যু বা প্যাসিভ ইউথানেশিয়ায় সায় দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
এই নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতির প্রসঙ্গে দু’টি কারণও তুলে ধরেছে বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চ। এক হরীশের চিকিৎসাব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি এবং দুই রোগীর পক্ষে কোনটা ভালো তা বিচার করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। শেষ শুনানি পর্বে হরীশের জন্য় আরও একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে আদালত। সেই বোর্ডের রিপোর্টের ভিত্তিতেও এই রায়। গত ১৩ বছর ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হরীশ। কিন্তু এত চিকিৎসার পরেও শারীরিক ভাবে তাঁর কোনও উন্নতি হয়নি।
এদিন বিচারপতিরা হরীশের বাবা-মায়ের প্রশংসা করে বলেন, “দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে তাঁরা পুত্রের পাশ থেকে সরেননি। প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি — দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে যে, এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম খাবার ও সকল চিকিৎসাব্যবস্থা বন্ধ করাই এখন হরিশের জন্য মঙ্গলের।” আদালত নির্দেশ দিয়েছে, দিল্লির এইমসে হরীশকে ভর্তি করতে হবে। সেখানে অত্যন্ত নিপুণ ভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে তাঁর জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলতে হবে।
চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন হরীশ। পেয়িং গেস্ট হিসাবে একটি বাড়ির পাঁচতলায় থাকতেন তিনি। সেখানে আচমকা দুর্ঘটনা। ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট, পাঁচতলা থেক পড়ে যান হরীশ। গুরুতর আঘাত পান মাথায়। প্রাণ বাঁচলেও অক্ষম হয়ে পড়ে শরীর। গোটা শরীরেই সাড় থাকে না তাঁর। দুর্ঘটনার পর স্নায়ুর অসুখে ভোগান্তি। তারপর ১০০ শতাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। এরপর শুরু হয় জীবনযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব।
এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল, চিকিৎসকদের চেষ্টায় প্রাণে বেঁচে যান হরীশ। কিন্তু শরীরের প্রায় সমস্ত অঙ্গই বিকল হয়ে যায়। এরপর একটু একটু করে বিছানার সঙ্গে মিশে যেতে থাকেন হরীশ। দায়ের পড়ে দিল্লি হাইকোর্টের কাছে দ্বারস্থ হন হরীশের ৬২ বছরের বাবা অশোক রানা এবং মা নির্মলা দেবী। তাঁদের আবদন ছিল, মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে ছেলেকে প্যাসি ইউথানেশিয়া দেওয়া হোক। তখন ২০২৪ সাল। ছেলের অসহায়তা, আর দেখতে পারছিলেন না বৃদ্ধ দম্পত্তি। কিন্তু তাঁদের এই আবেদন গ্রাহ্য হয়নি। এই পর্বে হরীশের চিকিৎসা ও আইনি লড়াই চালানে নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করেছেন ওই দম্পত্তি। অবশেষে মিলেছে নিষ্কৃতিমৃ্ত্যুর অনুমোদন।