
ইজরায়েলি হ্যারপ, ইরানি শাহিদ বা রাশিয়ার ল্যানসেট। এক ডাকে চেনে বিশ্ব। সবকটিই হামলাকারী ড্রোন। এক নির্দেশেই শত্রুর ঘাঁটি উড়িয়ে দিতে ওস্তাদ। যেমন, ভারতের নাগাস্ত্র। পাকিস্তানের জঙ্গি পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে অব্যর্থ ওষুধের মতো কাজ করেছিল অপারেশন সিঁদুরে।
আসলে প্রতিরক্ষা খাতে বেসরকারি বিনিয়োগে মোদী সরকার সবুজ সঙ্কেত দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক দেশিয় সংস্থার উদ্ভাবনী দক্ষতা চমকে দিচ্ছে বিশ্বকে। এবার মাত্র এক বছরের মধ্যে স্রেফ খাতায় কলমে পরিকল্পনা থেকে একেবারে আকাশে উড়ান দিল ‘দিব্যাস্ত্র এম কে ৩’। ভারতের সম্পূর্ণ নিজস্ব ‘নেক্সট জেনারেশন’ লয়টারিং মিউনিশন। ‘লয়টার’ বা টার্গেটকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে ঘুরপাক খায় এই ধরণের ড্রোন। এতে থাকা ‘সেন্সর’ টার্গেটকে চূড়ান্ত করে দিলেই তার উপরে আছড়ে পড়ে। ড্রোনে থাকা বিস্ফোরক সহ ক্র্যাশ করে নিশানায়। চোখের নিমেষে ড্রোনে থাকা বিস্ফোরক ফেটে টার্গেট ধ্বংস।
কার্যকারিতায় আর পাঁচটা মিসাইলের চেয়ে তাই এই ‘লয়টারিং মিউনিশন’ একটু আলাদা। টার্গেটের দিকে সরাসরি হামলার বদলে টার্গেটের চারপাশের এয়ারস্পেসে উড়তে থাকে। দূর থেকে রিমোটের মাধ্যমে নির্দেশ দিলে, তখনই হামলা করে। জাপানি শব্দ ‘কামিকাজে’ থেকে এই ধরণের ড্রোনের নাম দেওয়া হয়েছে কামিকাজে ড্রোন। জাপানি শব্দ কামিকাজের মানে ‘পবিত্র’ বা ‘অনুকূল’ হাওয়া। ১৩০০ শতাব্দীতে মঙ্গোল সম্রাট কুবলাই খানের হামলা থেকে জাপানকে রক্ষা করেছিল শক্তিশালী টাইফুন। ওই ঘূর্ণিঝড়ে কুবলাই খানের বড় বড় রণতরী ডুবে যাওয়ায় ‘কামিকাজি’ শব্দর ব্যবহার শুরু। সম্প্রতি ভারতের কাওয়া UAV প্রাইভেট লিমিটেড নয়া নেক্সট জেনারেশন জেট চালিত লয়টারিং মিউনিশনের সফল পরীক্ষা করল।
দিব্যাস্ত্র ৩ আকাশে উড়তেই ভারতের আকাশযুদ্ধের ক্ষমতা বদলে গেল। দিব্যাস্ত্র ভারতের প্রথম জেট চালিত লয়টারিং মিউনিশন। জেট ইঞ্জিনটিও দিশি সংস্থার, বানিয়েছে ডিজি প্রপালশন। কোনও ক্রিটিকাল সাব-সিস্টেম পর্যন্ত বিদেশি নয়। আগাগোড়াই ভারতে তৈরি। এই নয়া আত্মঘাতী ড্রোন আগের যে কোনও ড্রোনের চেয়ে খতরনাক। আত্মনির্ভর ভারতের নয়া বিজ্ঞাপন। এর আগের দিব্যাস্ত্র এম কে ১ একটানা ৫০০ কিমি উড়তে পারত। দিব্যাস্ত্র ২ উড়তে পারত ১৫০০-২০০০ কিমি। কিন্তু দেশি টার্বো জেট চালিত দিব্যাস্ত্র ৩ আরও দূরে নিখুঁত হামলা করতে পারে।
দিব্যাস্ত্র এম কে ৩- কেন তুলনা ইরান বা ইজরায়েলি ড্রোনের সঙ্গে?
ড্রোন হামলাকে জিপিএস জ্যামিং করে আটকে দেওয়াও এখন আর নতুন কিছু নয়। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে হামেশাই হচ্ছে। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে, ভারতের নতুন কামিকাজে ড্রোনে রয়েছে ইন্টারনাল নেভিগেশন সিস্টেম বা INS… রয়েছে বারবার স্যাটেলাইট বদলে ট্র্যাকিংয়ের দক্ষতাও। ফলে যুদ্ধের সময় জিপিএস জ্যাম থাকলেও দিব্যাস্ত্র ৩-এর হামলা থামানো যাবে না। ইন্টারনাল ন্যাভিগেশন নির্ভর হামলা চালাবে ভারতের নিজস্ব কামিকাজে ড্রোন। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, যুদ্ধের সময় LAC ও LOC-র মতো উঁচু পাহাড়ি এলাকায় মানব বিহীন, রিমোট চালিত ড্রোন বিশেষ উপযোগী। ‘নাগাস্ত্র ১’-এর মতো ড্রোনকে হাতে করে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া যায়। সেখান থেকে শত্রু শিবিরকে নিশানা করে ছেড়ে দেওয়া যায়। পাহাড় চূড়া, লুকানো বাঙ্কার লক্ষ্য করে নির্ভুল নিশানা করতে পারবে ভারতের নয়া ড্রোনগুলি। সবচেয়ে বড় কথা, খুব কম খরচ করে যুদ্ধে জেতার জন্য ভাণ্ডারে এরকম ড্রোন থাকা এখন জরুরি। একটি মিসাইল ছুঁড়তেও ১ থেকে ৮ কোটি টাকা খরচ হয়, সেখানে তার ১০০ ভাগের এক ভাগ দামে এই ড্রোনগুলি হামলা করে শত্রুর এয়ার ডিফেন্সকে তছনছ করে দিতে পারে। সিদ্ধান্ত বদলালে দিব্যাস্ত্র ৩-কে হামলার নির্দেশ দেওয়ার পরেও সেটিকে ফের সেনা ঘাঁটিতে ফিরিয়েও আনা যাবে।