
নয়া দিল্লি: ৯২ বছর বয়সে চিরঘুমের দেশে চলে গেলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দীর্ঘ ১০ বছরে অনেক বিতর্কের মুখে পড়েছেন তিনি। অনেকেই বলেছেন, তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথাই ছিল না। অর্থনীতির দিশা দেশা দেখানো মনমোহনের মৌনতা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে অনেক। কর্মজীবনে অনেক উঁচু পদে থেকেও একাধিকবার অপমানিত হতে হয়েছে তাঁকে। দলের অন্দরেও ঘটেছে এমন অনেক ঘটনা।
রাজীব গান্ধীর জোকার ‘মন্তব্য’
১৯৮৬ সালের ঘটনা। রাজীব গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আর মনমোহন সিং সেই সময় ছিলেন প্ল্যানিং কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান। মনমোহন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উন্নয়ন নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলেন। তখন রাজীব তাঁকে তিরস্কার করেন। মনমোহনের উপস্থাপনা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে। পরের দিন রাজীবকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, প্ল্যানিং কমিশন হল একটি জোকার কমিশন।
রাজীবের এই মন্তব্যে মনমোহন খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পদত্যাগের সিদ্ধান্তও নেন। কিন্তু তা করেননি। ১৯৮৭ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন তিনি।
মনমোহনের বাজেট নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন কংগ্রেস সাংসদরাই
১৯৯১ সালের ঘটনা। মনমোহন সিংকে অর্থমন্ত্রী করেন পি ভি নরসিংহ রাও। তখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন তাঁকে। সেই সময় মনমোহন বাজেট পেশ করেন। তিনি লাইসেন্স রাজের বিলুপ্তির কথা বলেছিলেন, বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার জন্য একটি স্কিম তৈরির ঘোষণা করেছিলেন।
মনমোহনের এই ঘোষণার বিরোধিতা করেছিলেন কংগ্রেস সাংসদরাই। এমনকী কংগ্রেসের পত্রিকা ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’-এ বলা হয়েছিল এই বাজেট মধ্যবিত্তের ওপর আক্রমণ। সংসদীয় দলের বৈঠক ডেকে, সেখানেও মনমোহনের বিরুদ্ধে কথা বলেন কংগ্রেস সাংসদরা। তবে তাতেও অবিচল ছিলেন মনমোহন।
মন্ত্রিসভাতেও মত ছিল না মনমোহনের!
২০০৪ সালে মনমোহন সিং-কে প্রধানমন্ত্রী পদে বসান সোনিয়া গান্ধী। সেই সংক্রান্ত চিঠি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করতে মনমোহনের সঙ্গে সোনিয়া নিজেও গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার পর মনমোহন সোনিয়ার পরামর্শে মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করেন।
মনমোহন সিং-এর উপদেষ্টা সঞ্জয় বারু তাঁর অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার বইতে লিখেছেন, মনমোহন সরকারে তিনি অর্থমন্ত্রক নিজে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কংগ্রেস হাইকমান্ডের চাপে তাঁকে এই চেয়ারটি পি চিদাম্বরমকে দিতে হয়েছিল। মনমোহনের যে ক্যাবিনেট পছন্দ হয়নি, তেমনটা কানাঘুষো শোনা গেলেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের কারণে মনমোহন পুরো বিষয়ে নীরব ছিলেন।
রাহুল গান্ধীর অধ্যাদেশ ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা
২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট রাজনীতিতে অপরাধীদের প্রবেশ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। এর আওতায় দুই বছর বা তার বেশি সাজাপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদদের সদস্যপদ বাতিল এবং ছয় বছরের বেশি সাজা হলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মনমোহন সিং-এর সরকার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে বাতিল করতে একটি অধ্যাদেশ আনার সিদ্ধান্ত নেয়। মন্ত্রিসভা থেকে এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশও পাশ হয়। সেই সময় অধ্যাদেশের বিরোধিতা করেন বিরোধী দল ও কয়েকজন নেতাকর্মী। এদিকে সাংবাদিকরা রাহুল গান্ধীকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, তিনি রাস্তাতেই অর্ডিন্যান্সটি ছিঁড়ে ফেলবেন। রাহুলের এই বক্তব্যে মনমোহন গভীরভাবে আহত হয়েছিলেন।