
নয়া দিল্লি: বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, তা নিয়ে শুনানি শুরু করল সুপ্রিম কোর্ট। আজ, বুধবার শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে চলা একাধিক মামলার মধ্যে প্রথমে কর্নাটক হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি হবে। ওই মামলায় এক স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে কার্যত ‘যৌনদাসী’র মতো ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছিল।
সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলার শুনানি চলছে। এ দিন শীর্ষ আদালত বলে, ” বর্তমানে দেশে যে আইন রয়েছে, সেটিকে ব্যাখ্যা করে এই ধরনের ঘটনায় স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো সম্ভব কি না, প্রথমে তা দেখা হবে। এরপর বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনে থাকা ব্যতিক্রমের সাংবিধানিক বৈধতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।”
এই মামলায় কর্নাটক হাইকোর্টের রায়কে সমর্থন করছেন সিনিয়র আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং। তাঁর বক্তব্য, বিশেষ পরিস্থিতিতে বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনি ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো যেতে পারে। আদালতে ইন্দিরা জয়সিং জানান, সংশ্লিষ্ট মামলায় স্ত্রীকে তাঁর স্বামী কার্যত ‘যৌনদাসী’র মতো ব্যবহার করেছিলেন। সেই কারণেই কর্নাটক হাইকোর্ট বর্তমান আইনকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিল, যাতে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো যায়।
তবে আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং স্পষ্ট করে বলেন যে তিনি সরাসরি বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম বাতিল করার দাবি করছেন না। তাঁর যুক্তি, বর্তমান আইনকেই যথেষ্ট বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করে, এই ধরনের ঘটনাকে ধর্ষণের অপরাধের আওতায় আনা সম্ভব।
মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “এই যুক্তির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন রয়েছে। কোনও আইনে যদি নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকে, তা হলে সেই ব্যতিক্রমকে কী এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, যাতে নির্দিষ্ট ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো যাবে?”
বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সামনে যে দুটি প্রশ্ন রয়েছে, তা হল- প্রথমত, বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনে যে ব্যতিক্রম রয়েছে, সেটিকে কি সীমিতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? যাতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, বৈবাহিক ধর্ষণের এই ব্যতিক্রম আদৌ সংবিধানসম্মত কি না? যদি তা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হয়, তা হলে সেটি বাতিল করা হবে কি না।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, দুটি বিষয়ই খতিয়ে দেখা হবে। তবে আগে কর্নাটক হাইকোর্টের মামলাটিকে সামনে রেখে বর্তমান আইনের ব্যাখ্যার বিষয়টি বিচার করা হবে।
শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, “বিবাহিত মহিলাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে হয়েছে বলে কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা নিজের শরীরের উপর অধিকার শেষ হয়ে যেতে পারে না।”
তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন, “আদালত একটি ফৌজদারি আইন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। তাই প্রথমে দেখতে হবে, আইনে থাকা বৈবাহিক ধর্ষণের ব্যতিক্রমটি অযৌক্তিক বা সংবিধানবিরোধী কি না। তার পরেই নির্দিষ্টভাবে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব।”
বিচারপতি বাগচী আরও জানান, বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম থাকার অর্থ এই নয় যে যৌন হিংসার ঘটনায় স্বামী সব ধরনের ফৌজদারি দায় থেকে মুক্ত হবেন। যৌন হিংসার কারণে গুরুতর আঘাত বা মৃত্যু হলে অন্যান্য ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
শুনানিতে আইনজীবীরা ২০১২ সালের নির্ভয়া-কাণ্ডের পর ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনে আনা পরিবর্তনের বিষয়টিও তুলে ধরেন। সেই সময় ধর্ষণের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়েছিল। শুধু পুরুষাঙ্গ দিয়ে যৌন সংসর্গ নয়, অন্য ধরনের যৌন নির্যাতনও, যেখানে পেনিট্রেশন বা যৌন সংসর্গ হয়েছে, তা ধর্ষণের আওতায় আনা হয়।
একইসঙ্গে বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনি ব্যতিক্রমের ভাষাতেও পরিবর্তন করা হয়। যৌন সম্পর্কের পাশাপাশি যৌন আচরণ-এর কথাও আইনে যুক্ত করা হয়।
সিনিয়র আইনজীবী করুণা নন্দী শীর্ষ আদালতে বলেন, বিবাহিত সম্পর্কের মধ্যে অন্যান্য ধরনের যৌন হিংসার ক্ষেত্রেও এই আইনি ব্যতিক্রমের প্রভাব রয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাদ যাওয়ার পর এই ধরনের ঘটনায় আইনি প্রতিকারের বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলায় কেন্দ্রীয় সরকার আদালতকে আইনি বিষয়ে সাহায্য করবে। এই বিষয়ে কেন্দ্র ইতিমধ্যেই যে জবাব জমা দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই বক্তব্য রাখা হবে।
আদালত নির্দেশ দিয়েছে, কেন্দ্রের জমা দেওয়া জবাবের কপি দুই দিনের মধ্যে মামলার সঙ্গে যুক্ত সব আইনজীবীকে দিতে হবে। চূড়ান্ত শুনানির আগে সব পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখতেও বলা হয়েছে।
বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধের আওতায় আনা হবে কি না, সেই বিতর্ক সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয় মূলত দিল্লি হাইকোর্টের বিভক্ত রায়ের পর। ২০২২ সালের ১১ মে দিল্লি হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চে এই বিষয়ে মতপার্থক্য হয়। বিচারপতি রাজীব শকধর বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম বাতিল করার পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে বিচারপতি সি হরি শঙ্কর ওই ব্যতিক্রম বহাল রাখার পক্ষে রায় দেন।
এরপরই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে যায়। এবার শীর্ষ আদালত প্রথমে কর্নাটক হাইকোর্টের মামলায় বর্তমান আইনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম সংবিধানসম্মত কি না, সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে এগোবে সুপ্রিম কোর্ট।