
নয়া দিল্লি: অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে উত্তেজনা। আইটিবিপির প্রধান জানিয়েছেন, অরুণাচল প্রদেশে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় ভারত-চিনের সংঘর্ষ চলছে। এই প্রথম অরুণাচল প্রদেশে চিনের উৎপাত বা আগ্রাসন নিয়ে মুখ খোলা হল। এরপরই কেন্দ্রীয় সরকারের তরফেও বিবৃতি দেওয়া হল। ভারতের তরফে বলা হল, চিনের লাল ফৌজ যদি নির্দিষ্ট পেট্রোলিং প্যাটার্ন থেকে সরে আসে, তাহলেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। ভারত-চিনের সম্পর্কের উন্নতির জন্য সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা থাকা জরুরি বলেও জানিয়েছে ভারত।
বৃহস্পতিবার রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপির জওয়ানদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইন্দো-টিবেটিয়ান বর্ডার পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ কাপুর বলেন যে অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে বেশ কিছু জায়গায় সংঘর্ষ চলছে।
এই মন্তব্যের পরই বিতর্ক-জল্পনা তৈরি হয়। বিরোধীরা সুর চড়ায় যে কেন্দ্র কেন এতদিন চিনের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে মুখ খোলেনি। এরপরই বিদেশ মন্ত্রকের তরফে বিবৃতি দেওয়া হল। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “ভারত-চিন সীমান্তে চিনা সেনা নির্দিষ্ট টহলদারির নিয়ম থেকে সরে এলেই মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) বরাবর ভুল বোঝাবুঝি এবং ভুল পদক্ষেপ এড়াতে দুই দেশই কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাবে।”
তিনি আরও জানান, সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সম্পর্কে দুই দেশের বোঝাপড়া আরও স্পষ্ট করতে আলোচনা চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে ভারত ও চিন। এর ফলে সীমান্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নতির জন্য সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।”
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার রাজস্থানের আলওয়ারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপি (ITBP)-র প্রধান জানান, সীমান্তের সমস্ত ইউনিটে ড্রোন পরিচালনার জন্য বিশেষ প্লাটুন তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি, গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষের মতো পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করার জন্য ‘স্ট্রাইক’ নামে একটি নতুন প্রশিক্ষণ কোর্সও চালু করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ভারত ও চিনের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। এরপর পূর্ব লাদাখে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি বজায় ছিল। গত এক বছরে অবশ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে দুই দেশ।
২০২৪ সালের অক্টোবরে পূর্ব লাদাখের ডেপসাং ও ডেমচক থেকে সেনা সরানো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছয় ভারত ও চিন। এই দুটি এলাকাই ছিল পূর্ব লাদাখের শেষ দুটি সংঘাতপ্রবণ এলাকা। এর কয়েক দিন পরেই কাজানে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করার জন্য একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেই বৈঠকে।
এরপর গত বছরের অগস্টে চিনের তিয়ানজিনে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন-র বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে যান প্রধানমন্ত্রী মোদী। সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন তিনি। সেই সময় মোদী জানান, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে চিনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত।
গত মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের ফাঁকেও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “দুই দেশকেই পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির প্রতি সংবেদনশীল থাকতে হবে। পারস্পরিক সম্মান, সংবেদনশীলতা এবং স্বার্থ—এই তিনটি নীতির ভিত্তিতেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া উচিত।”
ভারতের বক্তব্য, সীমান্তের অমীমাংসিত সমস্যাগুলি সমাধান করতে এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে দুই দেশকে কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির জন্য সীমান্তে শান্তি বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।