
নিউ ইয়র্ক: আমেরিকার মাটিতে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-র বার্তা দিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর প্রধান মোহন ভাগবত। ২৯ অগস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রশন'(Universal Oneness Celebration) নামক অনুষ্ঠানে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল আমেরিকান হিন্দুস ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়লগ (AHEAD Forum)। সেখানেই ভারতের বিশ্বদর্শন, বৈচিত্র্য, ধর্ম এবং প্রবাসী ভারতীয়দের দায়িত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখেন আরএসএস প্রধান।
নিউ ইয়র্কের অনুষ্ঠানে মোহন ভাগবত বলেন, “আমেরিকার কথা উঠলে একটি শব্দ বারবার আলোচনায় আসে। তা হল বহুত্ববাদ। আর ভারতের ক্ষেত্রে বলা হয় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য।” তাঁর কথায়,ভারতের ক্ষেত্রে ঐক্য ও বৈচিত্র্য,এই দুটিই দেশের ডিএনএ-তে রয়েছে। আরএসএস প্রধান বলেন, “আমরা এক। আর বৈচিত্র্য সেই ঐক্যকে সাজিয়ে তুলেছে। তাই বৈচিত্র্যকে উদযাপন করতে হবে, সম্মান করতে হবে এবং গ্রহণ করতে হবে।” স্বামী বিবেকানন্দের প্রসঙ্গ টেনে বলেন,”প্রত্যেকটি দেশেরই একটি বার্তা দেওয়ার, একটি লক্ষ্য পূরণ করার এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনোর দায়িত্ব রয়েছে।”
ভারতের বিশ্বব্যাপী ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে ভাগবত জানান, বিশ্বের সামনে বারবার ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-র উপলব্ধি তুলে ধরাই ভারতের দায়িত্ব। তাঁর মতে, কোনও দেশ শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে তৈরি হয় না। বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে।”
মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে RSS প্রধান বলেন, পৃথিবীতে দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে রয়েছে ‘নিজে বাঁচো’ এবং ‘অন্যকে বাঁচতে দাও’। অন্যদিকে এমন মানসিকতাও রয়েছে, যেখানে বলা হয়, ‘যারা আমাদের কথা মানবে, শুধু তারাই বাঁচবে’। তাঁর মতে, মতামত, চিন্তাভাবনা কিংবা একজন মানুষ অন্যের কাছে কতটা প্রয়োজনীয়, এই বিষয়গুলির তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল প্রত্যেকেই মানুষ। জীবনকে টিকিয়ে রাখতে হলে একসঙ্গে বাঁচতে হবে। ভাগবত বলেন, “মানুষের শরীর থেকে বাহ্যিক পরিচয়, সবকিছু আলাদা হলেও প্রত্যেকের মধ্যে এমন কিছু রয়েছে যা এক। তাঁর কথায়, “আমরা একে অপরের।”
ধর্মের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, “যে নীতি সবকিছুকে একত্রিত করে, সবকিছুকে ধারণ করে, বিভেদ সৃষ্টি হতে দেয় না এবং ভারসাম্য বজায় রাখে, তাই-ই হল ‘ধর্ম’।
পরিবেশের প্রতি মানুষের দায়িত্বের কথাও উঠে আসে RSS প্রধানের বক্তব্যে। তিনি বলেন,”খাবার খাওয়ার আগে মনে রাখতে হবে সেই খাবারের পিছনে কৃষকের পরিশ্রম রয়েছে। একইভাবে আমরা যে পোশাক পরি, তার পিছনেও কারখানার শ্রমিক থেকে তুলো উৎপাদনকারী , অনেক মানুষের অবদান রয়েছে। তাঁর কথায়,”মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অন্য কারও অবদান রয়েছে। তাই সমাজ ও পরিবেশ থেকে যা পাওয়া হচ্ছে, তার প্রতিদান দেওয়ার দায়িত্বও মানুষের রয়েছে।”
ভারতের বিশ্বব্যাপী ভূমিকা প্রসঙ্গে ভাগবত বলেন,”নিজের মুক্তি এবং বিশ্বের কল্যাণের জন্য এই জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ভারতের লক্ষ্য। তবে তা শুধুমাত্র প্রচারের মাধ্যমে নয়, নিজেদের কাজ ও জীবনযাত্রার মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করে করতে হবে।”
আমেরিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের উদ্দেশেও বিশেষ বার্তা দেন মোহন ভাগবত। তিনি বলেন, “প্রবাসী ভারতীয়দের নিজেদের ‘কর্মভূমি’র প্রতি অনুগত থাকতে হবে। একইসঙ্গে জন্মভূমির মূল্যবোধ অনুসরণ করে টেকসই জীবনযাপন করতে হবে।” ভারতের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের কাছে এটিই প্রত্যাশা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠানের শুরুতে রাখিবন্ধনও পালন করা হয়। উপস্থিত ব্যক্তিরা একে অপরকে রাখি পরিয়ে ঐক্যের বার্তা দেন। এই প্রসঙ্গে ভাগবত বলেন, “অন্যের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যেই মুক্তির পথ রয়েছে এবং রাখিবন্ধনের বার্তাতেও সেই ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে মোহন ভাগবত ২০০ জন ধর্মীয় নেতার একটি ‘কল ফর অ্যাকশন’ প্রস্তাবও তুলে ধরেন। ৩০টি দেশের ১৮০ জন ধর্মীয় নেতা ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণের লক্ষ্যে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড ওয়ান হিউমানিটি’ (One World One Humanity)-র প্রস্তাবে কোনও সম্প্রদায়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলে বা তাঁদের বিরুদ্ধে হিংসার আশঙ্কা তৈরি হলে পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ২৫০টি সংগঠন। আমেরিকার ৩৯টি রাজ্য ও ৮৫০টি শহর এবং বিশ্বের ২৯টি দেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার প্রতিনিধি এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।