
নয়া দিল্লি: প্রায় দেড় মাসের আন্দোলন-অনশন (Neet Protest)। জোরালো দাবি উঠেছিল একটাই। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে ইস্তফা (Dharmendra Pradhan Resignation) দিতে হবে। এই দাবিতেই গত কয়েকদিন ধরে উত্তাল হয়েছে দিল্লি থেকে কলকাতা। প্রধানমন্ত্রী (PM Narendra Modi) অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, যুবসমাজের স্বার্থই সবার ঊর্ধ্বে। শুক্রবারই নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন সিজেপির (CJP Protest) দুই প্রতিনিধি। সেই বৈঠকে আজই দেওয়া হয়েছিল চূড়ান্ত সময়। সেই দাবি মেনে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। অনেকে এই পদক্ষেপকে ছাত্রদের নৈতিক জয় বলে মনে করছেন অনেকে। তবে, এই আন্দোলনের শুরুটা কবে হয়েছিল,ছাত্র আন্দোলন থেকে সরকারের পদক্ষেপ… গত কয়েকদিনে কী কী ঘটল, দেখে নেওয়া যাক।
মূলত, নিট প্রশ্ন ফাঁস ইস্যুতেই আন্দোলন। যদিও এই অভিযোগ শুধু ২০২৬ নয়, ২০২৪ সালেও উঠেছিল। একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। ২০২৪ সালের ৪ জুন নিট-ইউজি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ১২ জুন পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধান নীরব ছিলেন। এই বিষয়ে সরব হন বিরোধীরা। ২০২৪ সালের ১৬ জুন মুখ খোলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি জানান, দু’টি জায়গায় কিছু অনিয়মের কথা সামনে এসেছে। এনটিএ (NTA)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারাও যদি দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাঁদেরও রেহাই দেওয়া হবে না।
২০২৪ সালে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে, কিংপিন বা প্রধান চক্রী হিসাবে গ্রেফতার করা হয়েছিল সঞ্জীব কুমার ওরফে সঞ্জীব মুখিয়াকে। বিহার পুলিশ তদন্ত করছিল। পরে সিবিআই তদন্তভার নেয়। দিন কয়েক আগে সেই প্রধান অভিযুক্তকে ক্লিনচিট দেয় সিবিআই। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, তদন্তে সঞ্জীব কুমারের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ মেলেনি। তাই তাঁকে ক্লিনচিট দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের ৩ মে নিট পরীক্ষার আয়োজন করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি। ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন পরীক্ষায়। পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে। বহু ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং কোচিং সংস্থার দাবি ছিল, পরীক্ষার আগের রাতেই প্রশ্নপত্রের কিছু অংশ ফাঁস হয়ে গিয়েছিল।
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে দিল্লিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর ৩ মে-র নিট পরীক্ষা বাতিল করে NTA এবং পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা করা হয়। ঘটনার তদন্তভার তুলে দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI-র হাতে।
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লির শাস্ত্রী ভবনের সামনে বিক্ষোভে নামে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (NSUI)। অভিযোগ, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার স্বচ্ছতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে NTA। সংস্থার জবাবদিহি ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তোলা হয়।
৬ জুন মাসে নিট-ইউজির প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি। এরপর ২০ জুন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরু করেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বিক্ষোভ মঞ্চে যোগ দেন লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক।
পুনরায় ২১ জুন পরীক্ষা নেয় এনটিএ। দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত পরীক্ষা চলে। নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রশ্নপত্র পরিবহনে প্রথমবার ভারতীয় বায়ুসেনার (IAF) বিমান ব্যবহার করা হয়। দেশজুড়ে ৫৫১টি শহরের ৫ হাজার ৪৩৫টি কেন্দ্রে এবং বিদেশে ১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
১৬ জুলাই গভীর রাতে NEET-UG পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে এনটিএ।
মোট ১১.২১ লক্ষ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন।
৬৯০ বা তার বেশি নম্বর পেয়ে ১৩৮ জন সেরাদের তালিকায় স্থান পান।
তাঁদের মধ্যে ৯৩ শতাংশের বেশি প্রথমবার NEET-এ অংশ নিয়েছিলেন।
পুনরায় নিট পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশের পরও আন্দোলন থামেনি। ফল ঘোষণার পর বহু পরীক্ষার্থী সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করেন, তাঁদের প্রত্যাশিত নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলের বড়সড় অমিল রয়েছে। এক ছাত্রী দাবি করেন, তিনবার NTA-কে ইমেল করেও কোনও উত্তর পাননি। এরপর জুলাই মাসে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর-মন্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক।
দিল্লির যন্তর-মন্তরে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ চলতে থাকে। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, প্রশ্নফাঁসের নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
১৬ জুলাই সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতির পরে হস্তক্ষেপ করে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত নির্দেশ দেয়, ওয়াংচুক যাতে যথাযথ চিকিৎসা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
টানা ২০ দিন অনশনের পর শরীর ভেঙে গিয়েছিল ওয়াংচুকের। ওজন কমে গিয়েছিল অনেকটাই। কিন্তু, অনশনে অনড় ছিলেন তিনি। ১৮ জুলাই সকালে যন্তর-মন্তর থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। ভর্তি করা হয় সফদরজং হাসপাতালে। সোনমকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হন তাঁর স্ত্রী। প্রথমে দিল্লি হাইকোর্ট আবেদন খারিজ করে দেয়। হাইকোর্টের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, সরকারের সিদ্ধান্তে কোনও ভুল নেই। পরে ডিভিশন বেঞ্চে যায় তাঁর স্ত্রী। সোনমকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর অনশন শুরু করে অভিজিত দীপকে।
২০ জুলাই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party) ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির ডাক দেয়। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও সমর্থক সংসদের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেন। তাঁদের দাবি, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। পুলিশ মিছিল আটকালে রণক্ষেত্র পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ঘটনায় আন্দোলনকারীর পাশাপাশি বহু পুলিশও আহত হন।
ককরোচদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ একাধিক কংগ্রেস নেতা। এরপরই দিল্লি পুলিশ আটক করে তাঁদের। পরে ছেড়েও দেওয়া হয়। ঘটনার পর একে একে সরব হতে শুরু করেন বিরোধীরা। সংসদে বাদল অধিবেশন উত্তাল হয়। সংসদের ভিতরে-বাইরে চলে প্রতিবাদ কর্মসূচি।
নিট ইস্যুতে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মধ্যরাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিয়ো পোস্ট করে কড়া বার্তা দেন। তিনি জানান, দোষীদের শাস্তি দিতে গঠন করা হয়েছে ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্ট। শুধু তাই নয়, মন্ত্রিসভায় এই সংক্রান্ত নতুন বিল নিয়ে আলোচনা হবে।
২৬ দিনের অনশন প্রত্যাহার করেন সোনম ওয়াংচুক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর অনশন প্রত্যাহার করেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি জানান, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাই তিনি অনশন প্রত্যাহার করছেন। এদিকে, সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দীপকে জানান, তাঁদের দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ওই একইদিনে জে পি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক করেন সিজেপির দুই সদস্য। বৈঠকের শেষে তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তাঁরা অনড়। একইসঙ্গে আরও দু’টি দাবি জানান তাঁরা।
সকাল থেকে যন্তর-মন্তরে আন্দোলনে ঝাঁঝ বাড়াচ্ছিলেন বিক্ষোভকারীরা। মুহূর্তের মধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপরই দুপুরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।