লন্ডন থেকে লাদাখ, চেনা গণ্ডির বাইরেও ‘মেরুজ্যোতি’র খেলা! বিরল সৌরঝড়ে উদ্বেগ কেন?

Arora Borealis: সৌরঝড় পৃথিবীতে 'অতিথি' হয়ে এলে, মেরুপ্রদেশ ও তার আশপাশের আকাশে অরোরার দেখা পাওয়া যায়। এটাই দস্তুর। উত্তরে নাম অরোরা বোরিয়ালিস। দক্ষিণে নাম অরোরা অস্ট্রালিস। বাংলায় বলে 'মেরুজ্যোতি'।

লন্ডন থেকে লাদাখ, চেনা গণ্ডির বাইরেও ‘মেরুজ্যোতি’র খেলা! বিরল সৌরঝড়ে উদ্বেগ কেন?
আকাশে আলোর খেলা। Image Credit source: Facebook

| Edited By: ঈপ্সা চ্যাটার্জী

May 12, 2024 | 7:18 AM

কমলেশ চৌধুরী:

আকাশে আজ রঙের মেলা। দূরদূরান্তেও ‘মেরুজ্যোতি’র খেলা! অরোরা বোরিয়ালিস যে ভাবে চেনা গণ্ডির বাইরেও ধরা দিল, তাতে সুধীন দাশগুপ্তের লেখা গানের লাইন দুটো একটু অদলবদল করে নেওয়াই যায়। সৌরঝড় পৃথিবীতে ‘অতিথি’ হয়ে এলে, মেরুপ্রদেশ ও তার আশপাশের আকাশে অরোরার দেখা পাওয়া যায়। এটাই দস্তুর। উত্তরে নাম অরোরা বোরিয়ালিস। দক্ষিণে নাম অরোরা অস্ট্রালিস। বাংলায় বলে ‘মেরুজ্যোতি’। তবে নানা কারণে সাদার্ন লাইটের চেয়ে নর্দার্ন লাইটের জৌলুস বরাবরই বেশি। রঙের সেই খেলা দেখতে উত্তর মেরুর কাছে ছুটে যান অনেকেই। কিন্তু এ বার বিরল দৃশ্য, শুধু উত্তর মেরুর কাছে নয়, অনেকটা দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকেও মেরুজ্যোতির ছটা দেখল জনতা। সাক্ষী আমেরিকার টেক্সাস, ক্যারোলাইনা, জর্জিয়ার মতো ‘দক্ষিণী’ প্রদেশ। সাক্ষী ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, সুইৎজারল্যান্ডের একটা বড় অংশও, যেখানে চট করে অরোরার উপস্থিতি নজরে পড়ে না। নেপথ্যে, বিরল এবং অতি শক্তিশালী সৌরঝড়। আমেরিকার ন্যাশনাল ওশনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, ২০০৩ সালের পর এই প্রথম এত শক্তিশালী সৌরঝড় হল। যাকে বলা হচ্ছে জি-ফাইভ গোত্রের জিওম্যাগনেটিক স্টর্ম।

নর্দান লাইটস বা অরোরা বোরিয়ালিস।

ঝড় চলছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। রাত জেগে ক্যামেরাবন্দি করা অরোরার ছবি আপলোডের ঝড়। যাদের মধ্যে রয়েছেন বহু প্রবাসী বাঙালিও। যেমন, ব্রিটেনের কর্নওয়াল কাউন্টিতে থাকেন প্রবাসী বাঙালি অনুরাগ রায়। ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বেডরুমে শুয়ে অরোরা দেখতে পাব, কখনও ভাবিনি।’ কানাডার মনট্রিয়ালে থাকেন উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের তরুণী সঞ্জিমা পাল। গত ডিসেম্বরে আলাস্কায় গিয়েছিলেন অরোরা দেখতে। এ বার মন্ট্রিয়ালে, ঘরের কাছেই অরোরা-দর্শন। সঞ্জিমা বললেন, ‘মন্ট্রিয়াল শহর, এখানে কখনও অরোরা দেখিনি, এবার দেখতে পেলাম। এত ভালো আলো ছিল, মোবাইলেও দিব্যি ছবি উঠেছে।” আলাস্কায় গিয়ে অরোরা দেখেছিলেন টরেন্টোর প্রবাসী বাঙালি অর্ক দে-ও। এ বার টরেন্টোয় বসেই আকাশ জুড়ে মেরুজ্যোতি দেখে ফেললেন আদতে কাঁচরাপাড়ার বাসিন্দা। বলছেন আলোর মান আলাস্কার চেয়েও ভালো! লন্ডন, বার্মিংহাম শহরের আকাশেও চটকদার রং ছড়িয়েছে অরোরা। সাক্ষী ভারতও। লাদাখের হ্যানলে ও লাগোয়া অঞ্চলে লেন্সবন্দি হয়েছে অরোরা। আকাশের রঙের পরিবর্তনের ‘টাইম ল্যাপস’ রেকর্ড হয়েছে হ্যানলের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের অবজারভেটরিতে।

এ যেন অরোরার ‘হোম ডেলিভারি’! কী ভাবে সম্ভব হল?

তার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক, অরোরা বোরিয়ালিস বা মেরুজ্যোতি কখন দেখা যায়। সৌরঝড় সূর্য থেকে পৃথিবীতে পৌঁছলে প্রথমেই বসুন্ধরার চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের বাধার মুখে পড়ে। তবে বাধা পেলেও, নিরক্ষীয় অঞ্চলের চেয়ে মেরুঅঞ্চলে ঢোকার রাস্তা ‘সহজ’। সমান্তরাল গতিপথই রাস্তা বাতলে দেয়! সৌরঝড় মানেই আধানযুক্ত কণার স্রোত। তা পৃথিবীতে ঢুকতেই, ইলেকট্রনের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলে ইলেকট্রনের শক্তির হাতবদল, বায়ুমণ্ডলে পরিবর্তন এবং তারই চূড়ান্ত ফলাফল আকাশ জুড়ে আলোর মেলা।

এ বার আলোর মেলা দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ল, তার কারণ একটাই, শক্তিশালী সৌরঝড়। গত ২১ বছরে এমন সৌরঝড় পৃথিবীতে আসেনি। আমেরিকার ন্যাশনাল ওশনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, সূর্যের যে অঞ্চলে সৌরঝড়, তা পৃথিবীর পরিধির ১৭ গুণ। ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের ডিরেক্টর সন্দীপ চক্রবর্তীর কথায়, ”ওই তল্লাট সূর্যের মোট পরিধির প্রায় ১৪ শতাংশ। প্রায় ২ লাখ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে এই সানস্পটের ক্লাস্টার। বোঝাই যাচ্ছে, সূর্যের অনেকটা অঞ্চল মারাত্মক সক্রিয়। বিপুল পরিমাণে চৌম্বকীয় শক্তি বেরিয়ে আসছে। তাই সৌরঝড়ের দাপট বেশি। তাই আশঙ্কাও অনেক বেশি। বেশ চিন্তাই হচ্ছে।”

সৌরঝড়।

কী চিন্তা? ২০০৩ সালের অক্টোবরে, হ্যালোউইনের সময় শেষবার যখন জি-ফাইভ গোত্রের সৌরঝড় পৌঁছয়, তখন প্রায় ভূত দেখার অবস্থা হয়েছিল অনেক দেশের। সুইডেনে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে যায়, ট্রান্সফর্মার নষ্ট হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকায়। এ বারও ভয় তাড়া করে চলেছে বিশ্বের তাবড় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রগুলিকে। সন্দীপবাবুর কথায়, ”সৌরঝড়ের আঁচ থেকে বাঁচতে, অনেক সংস্থাই নিজেদের উপগ্রহ সাময়িক ভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে পরিষেবার ঘাটতির আশঙ্কা থাকছে। আসলে একটু এদিক-ওদিক হলেই মহাকাশযান থেকে উপগ্রহ খারাপ হয়ে যেতে পারে। উপগ্রহ বন্ধ থাকলে জিপিএস থেকে ইন্টারনেট পরিষেবা, সব সাময়িক ভাবে হলেও ব্যাহত হতে পারে।” যেমন, স্টারলিঙ্কের কর্ণধার ইলন মাস্ক যেমন লিখেছেন, ”এখনও সব ঠিকঠাক। তবে ভয়াবহ চাপ যাচ্ছে উপগ্রহের উপর।” ভারতের সৌরযান আদিত্য এল ওয়ান কেমন আছে, খোঁজ চলছে তারও।

আসলে রবির তেজ ‘আলো’ ছড়ালেও, ‘আঁধারে’ ডুবিয়ে দেওয়ার ভয়ও নেহাত কম নয়!

Follow Us