
নয়া দিল্লি: ১০ জুন এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হবে ভারত। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু (Jawaharlal Nehru)-র রেকর্ড ভেঙে, দেশের দীর্ঘতম মেয়াদ ধরে একটানা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের নজির গড়তে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi)।
জওহরলাল নেহেরু ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত মোট ৪৩৯৮ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আগামী ১০ জুন প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিসে ৪৩৯৯ দিন পূর্ণ হবে। তবে জওহরলাল নেহেরু এবং নরেন্দ্র মোদী যুগের সবচেয়ে বড় পার্থক্য কোনও রাজনৈতিক বা আদর্শগত নয়, বরং তা হল দেশের ভৌগলিক ও জনসংখ্যার বিপুল পরিবর্তন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ভারত ছিল প্রায় ৩৪ কোটি মানুষের এক তরুণ রাষ্ট্র, যা দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, খাদ্যসংকট ও দেশ গড়ার এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। আর আজকের ভারত ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ। বর্তমানে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র। একইসঙ্গে অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি এবং বিশ্বরাজনীতির এক অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
জওহরলাল নেহেরু যখন দায়িত্ব নেন, তখন বিশ্ববাসী মনে করেছিল ভারতের এই গণতান্ত্রিক পরীক্ষা ব্যর্থ হবে। ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন মাত্র ১৭ কোটি। আজ ভারতের ভোটার সংখ্যা ৯৫ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এটিই। শুধু সংখ্যা নয়, আজকের নির্বাচন ডিজিটাল প্রচার, সোশ্যাল মিডিয়া, ইভিএম এবং রিয়েল-টাইম ডেটা অ্যানালিসিসের ওপর দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে আজকের দিনে এই বিশাল গণতন্ত্রকে পরিচালনা করার চ্যালেঞ্জটা অনেকটাই আলাদা।
এই ৬২ বছরে রাজনীতির ময়দানও আমূল বদলে গিয়েছে। প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল মাত্র ৫০টি রাজনৈতিক দল। তখন কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। অন্যদিকে, আজ শত শত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ভোটে আঞ্চলিক দলগুলির প্রভাবও অপরিসীম। জোট রাজনীতি, আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশা এবং প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের যুগে যেকোনও প্রধানমন্ত্রীর জন্যই এই জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো এখন এক মস্ত বড় পরীক্ষা।
নেহেরুর আমলে ভারতের লক্ষ্য ছিল শিল্পায়ন, পরিকাঠামো তৈরি এবং স্বনির্ভরতা অর্জন করা। আজ ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ওয়াশিংটন, বেজিং বা মস্কোর সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি পড়ে ভারতের বাজারে। তাই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে শুধু অভ্যন্তরীণ বৃদ্ধিই নয়, বরং বিশ্ববাজারের ওঠানামা, জ্বালানি সংকট ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতাকেও একসঙ্গে সামাল দিতে হচ্ছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপ্লব সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। নেহেরুর যুগে সংবাদপত্র ও রেডিয়োর মাধ্যমে খবর পৌঁছাতে আগে দিন বা সপ্তাহ লেগে যেত। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রতিটি বক্তব্য বা নীতি মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশনে ছড়িয়ে পড়ে। জনমত তৈরি হয় রিয়েল-টাইমে। ফলে নাগরিকদের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বী হয়েছে। তাঁরা একই সঙ্গে বিশ্বমানের পরিকাঠামো, ডিজিটাল পরিষেবা, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং কর্মসংস্থান চান।
স্বাধীনতার পর ভারতের কণ্ঠস্বর ছিল মূলত নৈতিক। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই লক্ষ্য ছিল। আজকের ভারত বিশ্বমঞ্চে এক প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার মতো আন্তর্জাতিক বিষয়ে ভারত এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর ভূমিকা পালন করে।
১৯৫০-এর দশকে ভারতীয়দের মূল লড়াই ছিল টিকে থাকা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। কিন্তু একবিংশ শতকের ভারত অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আজকের নাগরিকরা শুধু স্থায়িত্ব চান না, তাঁরা চান উন্নত জীবনযাত্রা, উচ্চ আয়, বিশ্বমানের শিক্ষা এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের শক্তিশালী উপস্থিতি। আর এই বদলে যাওয়া মানসিকতাই আধুনিক ভারতের শাসনব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।