Supreme Court: ‘স্তনে হাত দেওয়া ধর্ষণের চেষ্টা নয়’, এই রায় শুনে হাইকোর্টকে তুলোধনা সুপ্রিম কোর্টের, এল কড়া নির্দেশ

CJI on Patna High Court Verdict: ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি স্বতঃপ্রণোদিত (suo motu) মামলার রায়কে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। সেই রায়ে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছিল, কোনও মহিলার পাজামার ফিতে টেনে ধরা বা তার স্তনে হাত দেওয়া ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ (Attempt to Rape) নয়।

Supreme Court: স্তনে হাত দেওয়া ধর্ষণের চেষ্টা নয়, এই রায় শুনে হাইকোর্টকে তুলোধনা সুপ্রিম কোর্টের, এল কড়া নির্দেশ
ফাইল চিত্র।Image Credit source: Getty Image

|

Jul 15, 2026 | 1:18 PM

নয়া দিল্লি:  মহিলার সালোয়ার খোলা এবং স্তনে হাত দেওয়া ধর্ষণের চেষ্টা নয়, এই রায় দিয়েছিল পটনা হাইকোর্ট (Patna High Court)। এই রায়ের জন্য এবার শীর্ষ আদালতে (Supreme Court) চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হল হাইকোর্টকে। দেশের বিভিন্ন আদালতে যৌন হেনস্থার মামলার রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারকদের সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে কড়া অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট। এই ধরনের মামলায় রায়দানের আগে বিচারকদের পড়াশোনা ও গবেষণার অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (CJI Surya Kant)।

সুপ্রিম কোর্টে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা-

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনের বেঞ্চে যৌন হেনস্থার মামলাগুলিতে বিচার বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করে একটি স্বতঃ প্রণোদিত মামলার শুনানি চলছিল। 

আইনজীবী শোভা গুপ্তা সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন পটনা হাইকোর্টের ওই রায়ের উপরে, যেখানে বলা হয়েছিল মহিলার সালোয়ার খোলা এবং তাঁর স্তনে হাত দেওয়া ধর্ষণের চেষ্টা নয়। পটনা হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, এই ধরণের রায় দেওয়ার আগে আরও গভীরভাবে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, “পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার অভাব রয়েছে। আদালতের কর্মীরা কিছুই করছেন না।”

বেঞ্চ ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা পটনা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণগুলির বিষয়ে একটি বিস্তারিত নির্দেশ জারি করবে।

শুনানি চলাকালীন, সুপ্রিম কোর্ট ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটির তৈরি করা একটি রিপোর্টও অনুমোদন করেছে, যেটিতে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলাগুলিতে বিচারবিভাগীয় সংবেদনশীলতার নির্দেশিকা রয়েছে। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে দেশের সমস্ত আদালতকে এই অনুমোদিত হ্যান্ডবুকে বা নির্দেশিকা বই-তে নির্ধারিত শব্দবন্ধ ও পরিভাষা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, এই রিপোর্টটি অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট সহ দেশের সমস্ত হাইকোর্টের ওয়েবসাইটে আপলোড করতে হবে, যাতে সবাই এটি দেখতে ও অনুসরণ করতে পারেন।

আদালত জানায়, “সমস্ত আদালত হ্যান্ডবুকে থাকা শব্দবন্ধ অনুসরণ করবে। পুলিশ স্টেশনগুলি যাতে এফআইআর (FIR) দায়ের এবং চার্জশিট জমা দেওয়ার সময় হ্যান্ডবুক অনুসরণ করে, সেজন্য রাজ্যগুলিকে সমস্ত থানায় নির্দেশ জারি করতে হবে। আমরা একটি বিস্তারিত রায়ও আপলোড করব।”

নির্দেশিকায় কী বলা হয়েছে?

শীর্ষ আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, দেশের সমস্ত আদালতকে আইনি হ্যান্ডবুক বা নির্দেশিকায় বলা প্রতিটি শব্দ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে। শুধু আদালতই নয়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্য সরকারগুলিকে অবিলম্বে সমস্ত থানায় নির্দেশ পাঠাতে হবে যাতে পুলিশ কর্মীরা এফআইআর (FIR) দায়ের করার সময় এবং চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার সময় এই সংবেদনশীলতার হ্যান্ডবুক পুরোপুরি মেনে চলেন। 

২০২৫ সালের ১৭ মার্চ এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি স্বতঃপ্রণোদিত (suo motu) মামলার রায়কে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। সেই রায়ে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছিল, কোনও মহিলার পাজামার ফিতে টেনে ধরা বা তার স্তনে হাত দেওয়া ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ (Attempt to physical Assault) নয়।

সম্প্রতি গত ৯ জুলাই পটনা হাইকোর্টও প্রায় একই রকম একটি রায় দেয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী শোভা গুপ্তা সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান যে যৌন হেনস্থা সংক্রান্ত মামলায় এই ধরনের সংবেদনশীলতা-হীন রায় প্রায়শই দেখা যাচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে শুনানি চলাকালীন বিচারপতি ভি. মোহনা প্রশ্ন তোলেন, এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট যে বিচারকদের সংবেদনশীল করার নির্দেশ দিয়েছিল, সেই নির্দেশটি কি পটনা হাইকোর্টের শুনানিতে তুলে ধরা হয়েছিল? এর জবাবেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিচারকদেরও কিছুটা পড়াশোনা-গবেষণা করার দায়িত্ব থাকে। কর্মীরা (আদালতের স্টাফ) তো কিছুই করছে না।”

পটনা হাইকোর্টের বিতর্কিত মামলাটি কী ছিল?

বিচারপতি পূর্ণেন্দু সিং-এর এজলাসে ওঠা এই মামলাটি ২০০৮ সালের একটি ঘটনার। অভিযোগকারী মহিলা জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে অমরপুরের একটি ছবি তোলার স্টুডিয়োতে গিয়েছিলেন। ছবি তোলার পর স্টুডিয়োর মালিক কম্পিউটারে ছবি দেখানোর অজুহাতে তরুণীর বাবাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর স্টুডিয়োর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে তরুণীকে যৌন হেনস্থা করার চেষ্টা করা হয়। তরুণীর চিৎকারে বাবা ছুটে এলে অভিযুক্ত পালিয়ে যায়।

নিম্ন আদালত (Trial Court) সেই সময় অভিযুক্তকে ধর্ষণের চেষ্টা এবং অন্যায়ভাবে আটকে রাখার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। কিন্তু অভিযুক্ত সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে পটনা হাইকোর্টে আবেদন জানায়।

হাইকোর্টের যুক্তি-

পটনা হাইকোর্ট পুরো মামলার তথ্য ও প্রমাণ নতুন করে খতিয়ে দেখে জানায় যে ধর্ষণের চেষ্টার পক্ষে কোনও জোরাল মেডিক্যাল রেকর্ডে নেই। তাছাড়া মামলার তদন্তকারী অফিসারকেও (IO) জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। পুরো মামলাটি কেবল ওই তরুণী এবং তাঁর বাবা-মায়ের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল।

হাইকোর্ট তাদের রায়ে বলে, ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩৭৫ এবং ৩৭৬ ধারা অনুযায়ী সামান্যতম পেনিট্রেশন (penetration) বা ধর্ষণের স্পষ্ট চেষ্টার প্রমাণ ছাড়া এটিকে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ বলা যাবে না। তবে হাইকোর্ট মেনে নেয় যে স্টুডিয়োর দরজা বন্ধ করে সালোয়ার খোলার চেষ্টা ও স্তন চেপে ধরার ঘটনাটি ঘটেছে। আদালত জানায়, এটি ধর্ষণের চেষ্টা না হলেও, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারা অনুযায়ী কোনও মহিলার ‘শ্লীলতাহানি’ বা শালীনতা ক্ষুণ্ণ করার অপরাধের (Outraging a woman’s modesty) অধীনে পড়ে। এই যুক্তিতেই হাইকোর্ট ধর্ষণের চেষ্টার সাজা বাতিল করে, এটিকে শ্লীলতাহানির অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

Follow Us