
নয়া দিল্লি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কড়া অবস্থান সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়ো বা অস্তিত্বহীন মামলার নজির (Precedent) কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। সাফ জানিয়েছিল শীর্ষ আদালত।
বৃহস্পতিবার একটি মামলার পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-তৈরি ভুয়ো বা ‘হ্যালুসিনেটেড’ তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া কোনও রায় আইনের চোখে বৈধ সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে না। এমনকী, বিচার প্রক্রিয়ায় সামান্যতম ভুয়ো তথ্যের প্রভাব থাকলেও সেই রায় বাতিল করা হতে পারে বলে স্পষ্ট করেছে দেশের শীর্ষ আদালত।
বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের বেঞ্চ এসেল ইনফ্রাপ্রজেক্টস লিমিটেডের (Essel Infraprojects Ltd)-র দেউলিয়া সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে। মামলার নথি খতিয়ে দেখে আদালতের নজরে আসে যে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল (NCLT)-এর রায়ে এমন একাধিক রায়ের নজিরের উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলির কোনও অস্তিত্বই নেই অথবা যেভাবে সেগুলিকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, আদালতে এআই (AI) দিয়ে তৈরি তথ্য ব্যবহার করা নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু যাচাই না করে ভুয়ো তথ্যকে আদালতের কাছে প্রকৃত নজির হিসেবে পেশ করা বা তার উপর নির্ভর করা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আদালত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, কোনও আইনজীবী যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি রায় বা উদ্ধৃতি যাচাই না করেই আদালতে পেশ করেন, তবে তা পেশাগত অসদাচরণ বা মিসকনডাক্ট (Misconduct) বলে গণ্য করা হবে। একইভাবে কোনও বিচারক যদি সেই ভুয়ো তথ্যের উপর নির্ভর করে রায় দেন, সেটিও গুরুতর ত্রুটি হিসাবে ধরা হবে।
সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ জানিয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ায় সামান্যতম ভুয়ো বা ‘হ্যালুসিনেটেড’ তথ্য ঢুকে পড়লেও বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এমন তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত আইনের দৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্য হতে পারে না। আদালতের ভাষায়, বিচারব্যবস্থার সততা (Integrity) বজায় রাখতে বার এবং বেঞ্চ- উভয় পক্ষকেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট এ-ও স্পষ্ট করেছে যে এই রায় এআই(AI) প্রযুক্তির বৈধ বা দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিরুদ্ধে নয়। গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ বা অন্যান্য কাজে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এআই যদি ভুয়ো বা অস্তিত্বহীন তথ্য তৈরি করে, তা যাচাই না করে আদালতে ব্যবহার করা যাবে না।
ন্যাশনাল কোম্পানি ল অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল (NCLAT)-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের প্রশ্ন, ভুয়ো ও অস্তিত্বহীন রায়-গুলি কীভাবে আপিলের সময়ও ধরা পড়ল না? একই সঙ্গে বার কাউন্সিলকে এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাঙ্ক এসেল ইনফ্রাপ্রজেক্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে দেউলিয়া আইন (IBC)-এর ৭ নম্বর ধারায় আবেদন করেছিল। অভিযোগ ছিল, সংস্থাটি প্যান ইন্ডিয়া ইউটিলিটিস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (Pan India Utilities Distribution Company Ltd)-এর ঋণের জন্য কর্পোরেট গ্যারান্টি দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ২৮ অগস্ট এনসিএলটি মুম্বই মামলাটি গ্রহণ করে। পরে সংস্থার সাসপেন্ডেড ডিরেক্টর পূজা রমেশ সিংহের পক্ষে উপস্থিত সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাধবী দিবান দাবি করেন, ট্রাইব্যুনাল যে ছয়টি রায়ের উপর নির্ভর করেছে, তার কয়েকটির কোনও অস্তিত্বই নেই এবং কয়েকটি আবার মামলার সঙ্গে কোনওভাবেই প্রাসঙ্গিক নয়। এরপরই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নজরে আসে এবং এআই দিয়ে তৈরি ভুয়ো তথ্যের ব্যবহার নিয়ে কড়া অবস্থান নেয় সুপ্রিম কোর্ট।