
নয়া দিল্লি: নয়-নয়বার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের সময় এড়ানোর পর, বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) রাতে দিল্লির আবগারি নীতি মামলায় গ্রেফতার হলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী তথা আম আদমি পার্টি প্রধান অরবিন্দ কেজরীবাল। এর আগে এই একই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন একের পর এক হেভিওয়েট আপ নেতা -দিল্লির প্রাক্তন উপ-মুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া, সাংসদ সঞ্জয় সিং। গ্রেফতার হয়েছেন বিআরএস নেত্রী কে কবিতাও। কী এই দিল্লির আবগারী নীতি, যা প্রত্যাহার করার পরও, দিল্লির প্রায় পুরো মন্ত্রিসভা ঢুকে গেল জেলে?
নয়া আবগারি নীতি
২০২১ সালে দিল্লিতে মদ বিক্রির এক নয়া নীতির প্রবর্তন করেছিল কেজরীবাল সরকার। অধিকাংশ রাজ্যেই মদ বিক্রির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে। কিন্তু দিল্লি নয়া নীতি ছিল ব্যতিক্রমী। মদ বিক্রির বিষয়ে সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। শুধুমাত্র বেসরকারি দোকানগুলিকে মদ বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। মদের হোম ডেলিভারির অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। ভোর ৩টে পর্যন্ত দিল্লিতে মদের দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। মদের লাইসেন্স থাকলে, মদের উপর সীমাহীন ছাড়ও দেওয়ার অনুমতি ছিল। আপ সরকার বলেছিল, এই নয়া আবগারি নীতির মূল লক্ষ্য হল মদের কালোবাজারি বন্ধ করা। সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করা। সেইসঙ্গে উপভোক্তাদের মদ কেনার সুবিধা করে দেওয়া। এই নীতি থেকে প্রথম বছরে সরকারের আয় ২৭ শতাংশ বেড়েছে বলেও জানিয়েছিল আপ সরকার। প্রায় ৮,৯০০ কোটি টাকা আয় হয়েছিল।
আবগারি নীতি মামলা
একটি সিবিআই এবং একটি ইডি – দিল্লির আবগারি নীতিকে কেন্দ্র করে তহবিল তছরুপের অভিযোগে দুটি মামলার তদন্ত চলছে। নীতি চালুর পরপরই, প্রথমে দিল্লি পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা এর পিছনে দুর্নীতির গন্ধ পেয়েছিল। তারা একটি রিপোর্ট দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারকে। এরপর, ২০২২-এর জুলাইয়ে দিল্লির মুখ্য সচিব নরেশ কুমার, উপরাজ্যপাল ভিকে সাক্সেনা এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। তা থেকেই এই মামলার উদ্ভব ঘটে।
কী বলা হয়েছিল রিপোর্টে?
রিপোর্টে বলা হয়েছিল, আবগারি মন্ত্রী হিসাবে মনীশ সিসোদিয়ার ‘স্বেচ্ছাচারী এবং একতরফা সিদ্ধান্ত’-এর ফলে আনুমানিক ৫৮০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছিল সরকারের। অ্যালকোহল ব্যবসার মালিক ও অপারেটরদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে অর্থ পেয়েছিল আপ। যা ২০২২-এর গোড়ায় পঞ্জাব এবং গোয়ার বিধানসভা নির্বাচনে ব্যবহার করা হয়েছিল।
মণীশ সিসোদিয়ার গ্রেফতারি
রিপোর্টটি সিবিআই-এর কাছে পাঠান ভিকে সাক্সেনা। এরপর সিবিআই মণীষ সিসোদিয়ার বাড়ি-সহ তাঁর সঙ্গে যোগ আছে এমন ৩১টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালায়। এরপর গ্রেফতার করা হয় মণীষ সিসোদিয়াকে। পরে, সিসোদিয়া এবং আপের কমিউনিকেশন ইনচার্জ বিজয় নায়ার-সহ আরও ১৪ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে সিবিআই।
আসরে ইডি
এরপর, আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডিও। তদন্ত করে ইডি বলেছিল, অর্থ নয়ছয়ের পরিমাণ ২৯২ কোটি টাকারও বেশি। ইডি অভিযোগ করে, পাইকারি মদের ব্যবসা ব্যক্তিগত সংস্থাকে দেওয়ার বদলে তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছে আপ। ‘সাউথ গ্রুপ’ নামে পরিচিত একটি মদ লবি, গোয়ায় নির্বাচনী প্রচারের জন্য আপকে অন্তত ১০০ কোটি টাকা দিয়েছিল। নয়া আবগারি নীতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ফাঁক রাখা হয়েছিল, যাতে আপ নেতাদের পেছনের দরজা দিয়ে উপকার করা যায়।
কে কবিতা এবং তাঁর গ্রেফতারি
ইডির তদন্তে নাম উঠে আসে তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও-এর মেয়ে কে কবিতারও। সম্প্রতি, তাঁকে এই ‘সাউথ গ্রুপের’ অংশ হওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই গোষ্ঠীকে অযৌক্তিক সুযোগ সুবিধা দিয়ে বেশ কিছু পাইকারি এবং খুচরা মদের ব্যবসায় অংশীদারিত্ব পাইয়ে দিয়েছিল আপ সরকার।
কেজরীবালের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
কে কবিতাকে গ্রেফতারের পরই, ১৮ মার্চ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট অভিযোগ করে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল এই মামলায় অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী। কে কবিতা এবং অন্যদের সঙ্গে কেজরীবাল এবং মনীশ সিসোদিয়া-সহ আপের শীর্ষ নেতারা দিল্লির আবগারি নীতি নিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তাদের কীভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া যায়, তা আলোচনা করেছিলেন। এর বিনিময়ে, সাউথ লবির কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছিল আপ।
আপের বক্তব্য
আপ সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, এই মামলা এবং তার তদন্ত, বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা মাত্র। তারা তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে। এর আগে কেজরীবাল বলেছিলেন, “আবগারি কেলেঙ্কারি বলে কিছু নেই। আমরা দেশের সেরা এবং সবচেয়ে স্বচ্ছ নীতি তৈরি করেছি।”