
কলকাতা: দেশের ৩০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি হয় হরমুজ প্রণালী হয়। কিন্তু ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরুর চতুর্থ দিনেই এই প্রণালী বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় ইরান। রাশিয়া-চিনের তেলবাহী জাহাজগুলিকে প্রণালী পারাপারের অনুমতি দেওয়া হলেও, আমেরিকা, ইজরায়েল ও তাঁদের মিত্রপক্ষদের অনুমতি দেয় না ইরান। চোখের সামনে অশনি সংকেত দেখতে পায় নয়াদিল্লি। অন্তর্বর্তী বাণিজ্যিক সমঝোতার দরুন সবেই রাশিয়ার পরিবর্তে আমেরিকার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে জোর দিয়েছিল ভারতীয় তৈল শোধানাগারগুলি। কিন্তু সংঘাত আবহে সেই আমদানি খাতে তৈরি হয় সংকট।
প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক জানিয়েছিল, দেশের তৈল ভান্ডারগুলিতে যা তেল মজুত রয়েছে, তা যথেষ্ট। নির্দ্বিধায় চলে যাবে। কিন্তু তৃণমূল স্তরে পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রথমে রান্নার গ্যাসের দামবৃদ্ধি। তারপর সোমবার থেকে দেশজুড়ে গ্যাসের সংকট। মিলছে না বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার, এই অভিযোগ তুলে উষ্মা প্রকাশ করেছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের হোটেল অ্যাসোসিয়েশনগুলি। প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিও পাঠিয়েছে তাঁরা। বেঙ্গালুরুর হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এই রকম চলতে থাকলেও হোটেল সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। মুম্বইয়ে ইতিমধ্যেই ২০ শতাংশ হোটেল-রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চাপে পড়েছে কলকাতা হোটেল-রেস্তরাঁ ব্যবসায়ীরাও। তারপরই দেশজুড়ে জরুরি আইন জারি করেছে কেন্দ্র। কার্যকর হয়েছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ১৯৫৫। কিন্তু কী এই আইন, আচমকা কার্যকর করার কারণই বা কী? অতীতেও কি এই আইন কার্যকর করার কোনও নজির রয়েছে?
নয়াদিল্লি সূত্রে খবর, এলপিজি গ্যাসের জোগান বজায় রাখতেই এই আইন জারি করল কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক। যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এলপিজি সরবরাহকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু সেই বিশেষ ক্ষেত্রগুলি কী কী? জানা গিয়েছে, দেশের প্রতিটি গৃহস্থে পাইপলাইন ও সিলিন্ডার মাধ্যমে পাঠানো প্রাকৃতিক গ্যাস, পরিবহনের জন্য, এছাড়াও অন্যান্য জরুরি কাজে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সংবাদসংস্থা এএনআই সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই আইনের আওতায় কেন্দ্র আপাতত নির্দেশ দিয়েছে, গৃহস্থের কাজে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলপিজি সরবরাহে ১০০ শতাংশ অগ্রাধিকার দিতে হবে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের সংস্থাগুলিকে। ৮০ শতাংশ অগ্রাধিকার দিতে হবে বাণিজ্যিক প্রয়োজন ও চা শিল্পকে। ৭০ শতাংশ অগ্রাধিকার দিতে হবে ফার্টিলাইজ়ার প্ল্যান্ট এবং অন্যান্য রসায়নিক শিল্পকে।
১৯৫৫ সালে প্রণীত এই আইনের মাধ্যমে সরকার যে কোনও পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ এবং বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে, যা জনস্বার্থে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ বলে বিবেচিত। মূলত কালোবাজারি রোখা, মজুতদারি বন্ধ করা এবং ন্যায্য মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই আইন কার্যকর করে কেন্দ্র। খাদ্যশস্য, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি থেকে শুরু করে পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং ওষুধ— সবই এই আইনের আওতায় আসতে পারে। আপাতত এই আইনেরই ধারা ৩ এবং ধারা ৫-কে ব্যবহার করে দেশের অন্দরে পেট্রোপণ্যের উৎপাদন ও বণ্টনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে নয়াদিল্লি।
কিন্তু কোন কোন পণ্যের কথা এই অত্য়াবশ্যকীয় পণ্য আইনে উল্লেখ রয়েছে? আইন অনুযায়ী, যে কোনও রকমের ওষুধ, ফার্টিলাইজ়ার, খাদ্যপণ্য, শস্যপণ্য, পেট্রোপণ্য, তুলো, কাঁচাপাট এবং যে কোনও রকমের শস্য-বীজ — এই সকল পণ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কেন্দ্র। তবে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের পর থেকে কেন্দ্র যে এই কয়েকটি পণ্যকে ‘অত্যাবশ্য়কীয়’ বলে চিহ্নিত করে রেখেছে এমনটা নয়। আইন অনুযায়ী, পরিস্থিতি সাপেক্ষে কেন্দ্র যে কোনও পণ্যকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ বলে চিহ্নিত করে।
২০২০ সালে সংশোধনের মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে এই আইনের নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা এনেছিল সংসদ। সেই সংশোধনীর মাধ্যমে শস্য, ডাল, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্য তেলের ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়। তবে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতি সেই শিথিলতাকে তুলে নেওয়ার ক্ষমতাও কেন্দ্রের হাতেই রয়েছে। আইনে সাফ বলা হয়েছে, যদি উৎপাদনজাত পণ্যের খুচরো মূল্য ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় অথবা পচনশীল নয় এমন কৃষিপণ্যের মূল্য ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবেই সরকার মজুত সীমা বা Stock Limit নির্ধারণ করতে পারবে।
দেশে এর আগেও একাধিকবার এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন কার্যকর করা হয়েছে। কখনও গোটা দেশজুড়ে, কখনও বা রাজ্য়ভিত্তিতে। যেমন, ২০২০ সালে করোনা পর্বে দু’বার এই আইন কার্যকর করেছিল কেন্দ্র। সেই সময় স্যানিটাইজ়ারের কালোবাজারি রুখতে সেটিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। আবার কিছু মাস আগেই অর্থাৎ গতবছরের অগস্ট মাসে বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে গমের মজুত সীমা কমিয়ে দিয়েছিল কেন্দ্র।