কীভাবে বদলে গেল ভারতীয় নাগরিকত্বের সংজ্ঞা?

যার ৫ থেকে ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে এই সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি এই অনুচ্ছেদগুলো গৃহীত হয়। তবে এই অনুচ্ছেদগুলো স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়নি। দেশভাগের পর যখন লাখ লাখ মানুষ সদ্য টানা সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলেন, তখন সংবিধান চালুর দিনে ঠিক কারা নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন—তার একটি তাৎক্ষণিক তালিকা স্থির করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

কীভাবে বদলে গেল ভারতীয় নাগরিকত্বের সংজ্ঞা?

|

Sep 19, 2026 | 5:50 PM

কয়েক দশকের ব্যবধানে দিল্লির একই হাসপাতালে জন্ম গ্রহণ করে তিনটি শিশু। প্রথম শিশুটির জন্ম ১৯৭০ সালে। তৎকালীন আইন অনুযায়ী, জন্মের মুহূর্তেই সে ভারতীয় নাগরিক—কোনও শর্ত ছাড়া, তার বাবা-মা কে কিংবা তাঁরা কোথা থেকে এসেছেন, তা বিবেচনা না করেই।

দ্বিতীয় শিশুটির জন্ম ১৯৯৫ সালে। ততদিনে আইন বদলে গিয়েছে। সে কেবল তখনই নাগরিক হতে পারে, যদি তার বাবা-মায়ের মধ্যে অন্তত একজন জন্মসূত্রে বা আগে থেকেই ভারতীয় নাগরিক হন।

তৃতীয় শিশুটির জন্ম ২০১০ সালে। নিয়ম ততদিনে আরও কঠোর করা হয়েছে। তার নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য বাবা-মা দুজনকেই ভারতীয় নাগরিক হতে হবে, অথবা বাবা-মায়ের একজনকে নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি অপরজনকে ভারতে বেআইনিভাবে বসবাসকারী অনুপ্রবেশকারী হওয়া চলবে না।

একই হাসপাতাল। একই শহর। কিন্তু একই পরিণতি বা ভারতীয় পরিচয় পাওয়ার জন্য তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা আইনি পথ।

আমাদের অধিকাংশ মানুষই এই বিষয়টি নিয়ে কখনও ভেবে দেখেন না, কারণ অধিকাংশকে কখনওই এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়ের কাছে নাগরিকত্ব হল সহজ-স্বাভাবিক এমন এক জীবনব্যবস্থা, যার মধ্যে থেকে তাঁরা বেড়ে উঠেছেন। কিন্তু কোথাও না কোথাও, একটি নির্দিষ্ট ফর্মে লেখা একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে দিয়েছে আমাদের প্রত্যেকের যোগ্যতা কীভাবে নির্ধারিত হবে। সেই ফর্মের মূল ভিত্তিটি কী, তা জানা কিন্তু যথেষ্ট কৌতূহলদ্দীপক।

এই যাত্রার সূচনা খোদ ভারতের সংবিধানে, যার ৫ থেকে ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে এই সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি এই অনুচ্ছেদগুলো গৃহীত হয়। তবে এই অনুচ্ছেদগুলো স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়নি। দেশভাগের পর যখন লাখ লাখ মানুষ সদ্য টানা সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলেন, তখন সংবিধান চালুর দিনে ঠিক কারা নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন—তার একটি তাৎক্ষণিক তালিকা স্থির করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এরপর সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ পার্লামেন্টকে স্থায়ী আইন তৈরির দায়িত্ব দেয়। ১৯৫৫ সালে পার্লামেন্ট ‘নাগরিকত্ব আইন’ প্রণয়ন করে সেই দায়িত্ব পালন করে এবং পরবর্তীকালে ১৯৮৬, ২০০৩ এবং ২০১৯ সালে এতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনে।

এই আইনপুস্তক ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পাঁচটি পথ উন্মুক্ত রাখে: জন্মসূত্রে (by birth), বংশানুক্রমে (by descent), নিবন্ধনের মাধ্যমে (by registration), দেশীয়করণের মাধ্যমে (by naturalisation) এবং কোনও নতুন ভূখণ্ড ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে (by incorporation of territory)। এর মধ্যে জন্ম সংক্রান্ত নিয়মগুলোতেই সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে—ঠিক যেভাবে আমাদের গল্পটির তিন শিশু তা অনুভব করেছিল। একদম শুরুর দিকের উন্মুক্ত ‘জাস সোলি’ (Jus Soli — কোনও ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়ার ভিত্তিতে নাগরিকত্ব) নীতি থেকে আজকের শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা, যা মূলত ‘জাস স্যাঙ্গুইনিস’ (Jus Sanguinis — রক্তের সম্পর্ক বা বাবা-মায়ের পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব) নীতির দিকে বেশি ঝুঁকিযুক্ত।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি মূল নীতি শুরু থেকেই অপরিবর্তিত রয়েছে: ভারত কেবল এক একক নাগরিকত্ব (Single Citizenship) স্বীকার করে। এখানে কোনও দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ নেই, যেমনটা একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে মার্কিন ও ব্রিটিশ পাসপোর্ট ধারণ করতে পারেন। কোনও ভারতীয় নাগরিক যদি স্বেচ্ছায় অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে ভারতীয় আইন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব রদ হয়ে যায়। এই কারণেই ‘ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া’ (OCI) কার্ডের নামের মধ্যে ‘সিটিজেন’ বা নাগরিক শব্দটি থাকলেও, এটি প্রকৃতপক্ষে পূর্ণ নাগরিকত্ব নয়। এটি একটি আজীবন ভিসা এবং বেশ কিছু ব্যবহারিক অধিকার প্রদান করে ঠিকই, তবে ভোটাধিকার, পাসপোর্ট বা সংবিধানের অধীনে পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা দেয় না।

আইনের সাম্প্রতিকতম বড় পরিবর্তনটি আসে ২০১৯ সালের ‘নাগরিত্ব সংশোধনী আইন’ (CAA)-এর মাধ্যমে। এই আইনে বলা হয়, ধর্মীয় পীড়নের শিকার হয়ে পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা আফগানিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে প্রবেশ করা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান শরণার্থীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এটি সাম্প্রতিককালের ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত আইনগুলোর একটি। সমর্থকদের যুক্তি—নির্যাতিত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য, যাদের যাওয়ার আর কোনও জায়গা ছিল না, এটি একটি আইনি সুরক্ষার পথ খুলে দিয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে—দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা সংবিধানের সমতার অধিকারের ধারণার পরিপন্থী, এবং এই যুক্তিতে তাঁরা আদালতে চ্যালেঞ্জও জানিয়েছেন। উভয় পক্ষই একই সংবিধানকে আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। এই তর্কের নিষ্পত্তি এখনও হয়নি এবং এই নিবন্ধের উদ্দেশ্যও সেই বিতর্কের রায় দেওয়া নয়।

তবে সমস্ত সংশোধন এবং বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে যে মৌলিক সত্যটি অনুধাবন করা প্রয়োজন, তা হল: ভারতে নাগরিকত্ব কখনও কেবল জাতিগত বা ধর্মীয় উত্তরাধিকার সূত্রে সরাসরি পাওয়ার বিষয় ছিল না। এটি সংবিধানে দেওয়া ক্ষমতার ভিত্তিতে পার্লামেন্ট কর্তৃক সময়ে সময়ে লিখিত, পুনর্লিখিত এবং তর্ক-বিতর্ক করা একটি আইনি প্রক্রিয়া। এটি আগেও বদলেছে, সামনেও হয়তো আবার বদলাবে।

এখনও হয়তও কোনও হাসপাতালে জন্ম নিচ্ছে নতুন একটি শিশু, যে এমন এক আইনের অধীনে নাগরিকত্ব পাবে যা আমাদের কেউ লেখেনি এবং খুব কম মানুষই হয়তও পড়ে দেখেছে।

পরবর্তীকালে আইনটি কেমন হওয়া উচিত—তা নিয়ে নিজেদের মতামত চূড়ান্ত করার আগে, অন্তত একবার সেই নিয়মগুলো পড়ে দেখা হয়তও সত্যিই দরকার!

তথ্যসূত্র: ভারতের সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৫-১১); নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ এবং এর ১৯৮৬, ২০০৩ ও ২০১৯ সালের সংশোধনীবৃন্দ; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, ভারত সরকার।

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us