
ভারতের কোনও শহরে একটি বাড়ির সামনের রাস্তার আলোটা হঠাৎ একদিন খারাপ হয়ে গেল। পরের রাতেও আলো জ্বলল না। তৃতীয় রাতেও একই অবস্থা। তখন সেই বাড়ির সদস্যদের মুখেই শোনা যায় একটি সাধারণ কথা, যা প্রতি বছর দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বলে থাকেন। সেটা হল, ‘সরকারের কাছে কারও অভিযোগ করা উচিত।’
কিন্তু, কোন সরকার? কখনও ভেবে দেখেছেন?
ওই একটি স্ট্রিটলাইটের উপরেই রয়েছে প্রশাসনের তিনটি স্তর। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজধানীতে রাজ্য সরকার এবং আরও একটি সরকার, যা আপনার অনেক কাছাকাছি, আকারে অনেক ছোট এবং যাকে নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। হয়তো সেই স্ট্রিটলাইট থেকে খুব বেশি দূরেও নয় তার অফিস। এই তৃতীয় স্তরেরও একটি নাম রয়েছে। শহরের আকারের উপর নির্ভর করে তাকে বলা হয় মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন বা পুরনিগম, মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল বা পুরসভা কিংবা নগর পঞ্চায়েত। আর আপনার বাড়ির সামনের ওই স্ট্রিটলাইটটির দায়িত্ব আসলে এই পুর প্রশাসনেরই। প্রধানমন্ত্রীর নয়, মুখ্যমন্ত্রীরও নয়।
এই ব্যবস্থা কিন্তু আচমকা তৈরি হয়নি। ১৯৯২ সালে সংসদে পাশ হয়েছিল সংবিধানের ৭৪তম সংশোধনী। এর মাধ্যমে ভারতের শহরের পুর প্রশাসন প্রথমবার সংবিধানে স্থায়ী ও সুরক্ষিত জায়গা পায়। এর আগে রাজ্য সরকারগুলি নিজেদের মতো করে শহরের পুর প্রশাসনের কাঠামো তৈরি করতে পারত। এমনকী সেগুলি ভেঙেও দিতে পারত। কিন্তু ১৯৯২ সালের পর পুর প্রশাসনের জন্য সংবিধান স্বীকৃত নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। স্বাধীন রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সেই নির্বাচন হওয়ার কথা বলা হয়। নির্দিষ্ট মেয়াদও স্থির হয়।
একইসঙ্গে সংবিধানের দ্বাদশ তফসিলে এমন ১৮টি কাজের উল্লেখ করা হয়, যেগুলি পুরসভার তত্ত্বাবধানে থাকবে। সেগুলি হল রাস্তা, জল সরবরাহ, স্ট্রিটলাইট, সাফাই ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য, বস্তির উন্নয়ন, পার্ক, দমকল পরিষেবা। তালিকা এখানেই শেষ নয়।
তাই পরের বার আপনার এলাকার কোনও স্ট্রিটলাইট খারাপ হয়ে গেলে, রাস্তা দীর্ঘদিন ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকলে কিংবা দিনের পর দিন আবর্জনা না সরলে, যে দফতরের উপর সাধারণত সেই সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব রয়েছে, সেটি হয়তো আপনার থেকে মাত্র একটি ফোন কলের দূরত্বে।
এবার আরও কঠিন একটি প্রশ্ন। আপনার দৈনন্দিন জীবনের এতগুলি পরিষেবা দেওয়ার দায়িত্ব যদি পুরসভার হয়, তাহলে সেই সমস্ত কাজ করার জন্য তাদের হাতে কি পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে?রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া প্রতি বছর এই বিষয়টি নিয়ে সমীক্ষা করে। আর সেই সমীক্ষার ফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
ভারতের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনগুলি তাদের মোট আয়ের মাত্র প্রায় ৬০ থেকে ৬৪ শতাংশ নিজেরা সংগ্রহ করে। এই অর্থের প্রধান উৎস সম্পত্তি কর এবং বিভিন্ন ছোটখাটো চার্জ। বাকি প্রায় ৩৬ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ আসে রাজ্য অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান হিসেবে। এবার এর সঙ্গে সুইৎজারল্যান্ড, আইল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের শহরগুলির তুলনা করুন। সেখানে পুর প্রশাসন তাদের প্রয়োজনীয় অর্থের ৮০ শতাংশেরও বেশি নিজেরাই সংগ্রহ করে।
ভারতের পুরসভাগুলি সব মিলিয়ে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে, তা দেশের মোট জিডিপির এক শতাংশেরও কম। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে কাছাকাছি যে প্রশাসনিক স্তর, সেক্ষেত্রে এই অংশটি যথেষ্ট কম।
এই অর্থের ঘাটতির অর্থ কী? সাধারণভাবে বিষয়টি এভাবে ভাবা যেতে পারে। একটি শহরেরপুর প্রশাসন যদি প্রতি মাসে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অর্থের জন্য হাত পাতে, তাহলে বিষয়টি অনেকটা এমন একটি পরিবারের মতো, যারা নিজের উপার্জনের পরিবর্তে প্রতি মাসে কোনও আত্মীয়ের কাছে টাকা চাইছে।
তাতেও সংসার চলতে পারে। কিন্তু কোন কাজটি আগে করা হবে,স্ট্রিটলাইট আগে ঠিক হবে? নাকি নর্দমা? নাকি পার্ক? তা স্বাধীনভাবে ঠিক করার ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়।
এই পরিসংখ্যানের ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে আরও একটি গল্প। সংখ্যার মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যা সহজেই নজর এড়িয়ে যেতে পারে। ৭৪তম সংবিধান সংশোধনী শুধু শহরগুলিতে স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। এর মাধ্যমে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতির জন্যও আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
দেশের হাজার হাজার শহর ও নগরে নীরবে বদলে গিয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে কারা বসছেন। যে ঘরে বসে স্ট্রিটলাইট, জলের পাইপ কিংবা নর্দমা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেই ঘরে কারা বসবেন, সেখানেও পরিবর্তন এসেছে।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে, শহরের প্রতিটি নাগরিক সমস্যার পিছনে শুধুই অর্থের অভাব রয়েছে। অথবা হাতে থাকা অর্থ দিয়ে প্রত্যেকটি পুরসভা সমান দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে। কিছু পুরসভা সীমিত অর্থও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করে। আবার কিছু পুরসভা তা পারে না।
কিন্তু একটি বিষয় এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। কোনও স্ট্রিটলাইট খারাপ হলে সাধারণভাবে এবং কোনও নির্দিষ্ট মুখ ছাড়াই শুধু ‘সরকার’-কে দায়ী করলে অনেক সময় আসল দায়িত্ব কার এবং সমস্যার আসল সীমাবদ্ধতা কোথায়, সেটিই চোখ এড়িয়ে যায়।
একজন সাধারণ নাগরিকের সংবিধানের দ্বাদশ তফসিলের ১৮টি বিষয় মুখস্থ রাখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটুকু জানা জরুরি যে, আপনার এলাকার কোনও স্ট্রিটলাইটের সমস্যার কথা জানাতে হবে পুরসভাকে। প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর নয়। এই একটি তথ্য জানলেও বাস্তবে অনেক কিছু বদলে যায়।
অভিযোগ কোথায় জানাবেন, তা বদলে যায়। কোন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকে প্রশ্ন করবেন, তা স্পষ্ট হয়। কোনও সমস্যার জন্য কাকে যুক্তিসঙ্গতভাবে দায়ী করা যায় এবং কাকে যায় না, সেটিও বোঝা সহজ হয়।
তাই পরের বার কোনও খারাপ হয়ে পড়ে থাকা স্ট্রিটলাইটের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হয়তো ‘সরকার এটা ঠিক করছে না কেন?’-এই প্রশ্নের বদলে আরও একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, ‘এই শহরে ঠিক এই সমস্যাটি সমাধান করার জন্য আসলে কাকে নির্বাচিত করা হয়েছে?’
সূত্র: Reserve Bank of India, “Report on Municipal Finances” (2024); Ministry of Housing and Urban Affairs, Constitution (74th Amendment) Act, 1992, and the Twelfth Schedule; Election Commission of India and State Election Commission records on urban local body elections and reservation provisions.