
ভারতে যখন শেষবার জনগণনা হয়েছিল, তখন একটি সহজ প্রশ্ন করা হয়েছিল। প্রশ্নটা হল, আপনি বাড়িতে কোন ভাষায় কথা বলেন? সেখানে একটা, দু’টো বা ১০০টা নয়। মোট ১৯ হাজার ৫৬৯টি ভিন্ন উত্তর পাওয়া গেল।
যদি মনে করেন ১৯ হাজার ৫৬৯ জন মানুষ, তাহলে ভুল ভাববেন। মাতৃভাষার ১৯,৫৬৯টি আলাদা নাম। তার মধ্যে ছিল উপভাষা, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষ নিজেদের ঘরে বলা ভাষাকে যে স্থানীয় নামে চিহ্নিত করেন, সেই নামও রয়েছে। জনগণনার আধিকারিকরা বছরের পর বছর ধরে সেই তালিকা যাচাই করেন। সেখানে দেখা হয়, কোনগুলি সত্যিই আলাদা ভাষা এবং কোনগুলি আসলে একই ভাষা, শুধু স্থানীয়ভাবে ভিন্ন নামে পরিচিত।
যাচাই হওয়ার পর এক হাজার ৩৬৯টি মাতৃভাষাকে পৃথকভাবে গণনার উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়। সেগুলিকে আবার ১২১টি ভাষার মধ্যে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। আর এই ১২১টি ভাষায় প্রত্যেকটিতে অন্তত ১০ হাজার মানুষ কথা বলেন।
একটি দেশ। একটি জনগণনার ফর্ম। একই প্রশ্নের উত্তরে প্রায় ২০ হাজার আলাদা উত্তর। এর ব্যাখ্যা খোঁজার আগে বিষয়টি একবার ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এই ১২১টি ভাষার মধ্যে ২২টির বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা রয়েছে। এগুলি সংবিধানের অষ্টম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত এবং প্রতি ১০০ জন ভারতীয়র মধ্যে প্রায় ৯৭ জনের মাতৃভাষা ওই ২২টি ভাষার কোনও একটি। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাষা হিন্দি। দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ বাড়িতে হিন্দিতে কথা বলেন এবং তাঁদের বড় অংশের বসবাস উত্তর ভারতে। বাংলা, মারাঠি, তেলুগু, তামিল, উর্দু, গুজরাটি ও কন্নড়-এই ভাষাগুলির প্রত্যেকটিতেই কয়েক কোটি মানুষ কথা বলেন।
আর তারপর রয়েছে সংস্কৃত। অষ্টম তফসিলের ২২টি ভাষার মধ্যে সংস্কৃতও একটি। অথচ ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে মাত্র প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সংস্কৃতকে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। দৈনন্দিন কথোপকথনের তুলনায় আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় শাস্ত্রেই এই ভাষার উপস্থিতি বেশি।
এবার এমন একটি তথ্য রয়েছে, যা অনেককেই অবাক করবে। জানেন কি ভারতের সংবিধানে ঘোষিত কোনও ‘জাতীয় ভাষা’ নেই। হিন্দি ও ইংরেজি আসলে সরকারি কাজে ব্যবহৃত ভাষা। কিন্তু, তা ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশের ‘একমাত্র বা জাতীয়’ ভাষা হিসেবে কোনও ভাষাকে ঘোষণা করার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সংবিধান সচেতনভাবেই এমন কোনও ঘোষণা করা থেকে বিরত থেকেছে।
তাহলে দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল কেন? কারণ হল ভূগোল। কিছু দেশের মতো ভারত কোনও একটি জায়গাকে কেন্দ্র করে বিস্তার লাভ করেনি। বরং একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশের বিকাশ হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নদী উপত্যকা,উপকূল,পাহাড়ি গিরিপথ,মালভূমি, সড়ক, রেলপথ কিংবা রেডিওর মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা গড়ে তুলেছিল।
আরেকটি কারণ হল ইতিহাস। সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত ভাষাগুলি উত্তর ও পশ্চিম ভারত থেকে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে, ব্যবসায়ী, আক্রমণকারী, ধর্মপ্রচারক ও অভিবাসীরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন ফার্সি, আরবি, পর্তুগিজ ও ইংরেজি শব্দ। কোনও কোনও জায়গায় এর ফলে সম্পূর্ণ নতুন ভাষাও তৈরি হয়েছে।
কেউ পরিকল্পনা করে এই ভাষাগত বৈচিত্র্য তৈরি করেনি। বছরের পর বছর ধরে শুধু জমা হয়েছে। ঠিক যেমন একটি নদী তার দুই তীর থেকে পলি সংগ্রহ করতে করতে এগিয়ে চলে।
আরেকটি কারণ হল স্বাধীনতার পর ভারত নিজের সম্পর্কে একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে যখন দেশ তার অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলির সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করে,তখন তা মূলত ভাষার ভিত্তিতেই করা হয়েছিল। তেলুগু ভাষায় যাঁরা কথা বলেন, তাঁরা একটি রাজ্য পেলেন। যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তেলুগু ভাষা। অন্যদিকে, তামিল ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল আরেকটি রাজ্য।
গোটা বিষয়টার নেপথ্যে ছিল একটি বিশ্বাস। মানুষ এমন একটি রাজ্যে নিজেদের আরও বেশি আপন বলে মনে করবেন,যেখানে প্রশাসনও তাঁদের ভাষাতেই তাঁদের সঙ্গে কথা বলবে।
কয়েক দশক পর অধিকাংশ ভাষাবিদই হয়তো বলবেন, সেই সিদ্ধান্ত সত্যিই সফল হয়েছে। তবে, এর কোনওটিরই অর্থ এই নয় যে ভারতে ভাষার প্রশ্নটি একেবারে মসৃণ বা সমস্যাবিহীন।
কয়েক বছর পরপরই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। চেন্নাই বা কোহিমার একটি শিশুকে স্কুলে কতটা হিন্দি শিখতে হবে, সরকারি চাকরিতে ইংরেজির গুরুত্ব কতটা হওয়া উচিত কিংবা হিন্দি-প্রধান জাতীয় আলোচনায় কোনও রাজ্যের নিজস্ব ভাষা তার প্রাপ্য গুরুত্ব পাচ্ছে কি না। এই নিয়ে মতপার্থক্য চলছে। অতীতের কোনও মীমাংসিত অধ্যায় নয়। আর কোনও একটি লেখা দিয়ে এই সমস্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি করাও সম্ভব নয়।
তবে পরের বার বিতর্ক শুরু হলে এই পরিসংখ্যানগুলি কিছুটা প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে। ১২১টি ভাষাকে একসঙ্গে ধারণ করে রয়েছে একটি দেশ। তার মধ্যে ২২টি ভাষা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। ইউরোপের সমান আয়তনের একটি ভূখণ্ডে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ এই ভাষাগুলিতে কথা বলেন। ফলে এমন একটি দেশে কখনওই এমন কোনও একটি উত্তর খুঁজে পাবেন না, যা প্রত্যেক মানুষকে সমানভাবে সন্তুষ্ট করবে।
তবে, প্রশ্নটা এটা নয় যে ভারতে ভাষা নিয়ে সমস্যা তৈরি হবে কি না। সমস্যা তৈরি হওয়ারই ছিল। সেক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন হল, ভারত কি ভবিষ্যতেও সেই সমস্যার সমাধান একই পথেই করে যেতে পারবে? বলপ্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে, যুক্তরাষ্ট্রীয় সমঝোতার মাধ্যমে, ঠিক এই ভাষাগত টানাপড়েনকে মাথায় রেখে তৈরি করা রাজ্যের সীমানার মাধ্যমে কি সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে?
পরের বার যখন আপনি দূরপাল্লার ট্রেনে সফর করবেন, তখন একটি বিষয় লক্ষ্য করবেন। ট্রেনটি যখন এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে প্রবেশ করে,তখন খেয়াল করে দেখবেন ট্রেনে ঘোষণার ভাষাও বদলে যাচ্ছে।
এই ভাষা পরিবর্তন কোনও বিভ্রান্তি নয়। এটা একটা দেশের শব্দ, যে দেশ নীরবে একমত হয়েছে।