
রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে বসে বাবা ২০ টাকার চা কিনলেন। পাশে বসে থাকা ছেলে তাঁর বাবাকে টাকা দিতে দেখে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, এই টাকা কার কাছে যাবে?”
বাবা হেসে বললেন, “দোকানদারের কাছে।”
উত্তরটা ঠিক। তবে পুরোপুরি নয়।
দোকানদার সেই ২০ টাকা দিয়ে দুধ, চিনি, চা-পাতা কিনবেন। পাইকারি বিক্রেতা টাকা দেবেন তাঁর সরবরাহকারীকে। সেই টাকারই কোনও একটা অংশ যাবে কোনও শ্রমিকের হাতে। আবার কেউ সেই টাকা থেকে কর দেবেন। এভাবেই একটি ২০ টাকার নোট এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরতে থাকে। একজনের কাজের সামান্য অংশ অন্য একজনের জীবনে পৌঁছে যায়। আমাদের পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে গেলে, তখন আমরা সেটা লক্ষ্য করি। কিন্তু এরপর সেই টাকা কোথায় গেল, তা নিয়ে সাধারণত আর ভাবি না।
সরকারের টাকাও ঠিক একইভাবে ঘুরে বেড়ায়। শুধু সেই যাত্রাটা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।
আপনি হয়তো সরাসরি কোনও টাকার নোট সরকারের হাতে তুলে দেন না। কিন্তু আপনি যে জিনিসপত্র কিনছেন, তার বেশিরভাগের দামেই জিএসটি (GST) যুক্ত থাকে। আবার নির্দিষ্ট সীমার বেশি আয় হলে, সেই আয়ের একটি অংশ আয়কর হিসাবে সরকারকে দিতে হয়।
এভাবে কোটি কোটি মানুষের দেওয়া ছোট-বড় কর একত্রিত হয়ে তৈরি হয় সরকারের রাজস্ব। সহজ কথায়, যাকে আমরা বলি সরকারি টাকা।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই টাকা আসলে কার?
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে পুরো কেন্দ্রীয় বাজেটের লাখ কোটি টাকার হিসাব দেখার দরকার নেই। বরং ধরে নেওয়া যাক, সরকারের হাতে রয়েছে মাত্র ১ টাকা। তাহলে সেই ১ টাকা কোথায় যায়?
কেন্দ্রীয় বাজেটের হিসাবকে সহজ করে দেখলে একটি ছবি পাওয়া যায়।
প্রতি ১ টাকা সরকারি অর্থের মধ্যে—
অর্থাৎ, আপনার দেওয়া সরকারি টাকা শুধু একটি জায়গায় খরচ হয় না। তা নানা খাতে ছড়িয়ে যায়।
২২ পয়সা হয়তো চলে যায় এমন কোনও রাজ্যে, যেখানে আপনি কোনওদিন যাননি। ২০ পয়সা চলে যায় অতীতে নেওয়া ঋণের সুদ মেটাতে। ১১ পয়সা খরচ হয় দেশের প্রতিরক্ষায়।
বাকি অর্থ যায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, ভর্তুকি, পেনশন এবং সরকারের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ চালাতে।
এইভাবে দেখলে বাজেট আর শুধু কঠিন সংখ্যার হিসাব থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক টাকার যাত্রার গল্প। সেই যাত্রার কোনও এক জায়গায় আপনার দেওয়া টাকা হয়তো এমন কোনও গ্রামের রাস্তা তৈরিতে খরচ হচ্ছে, যেখানে আপনি কোনও দিন যাবেন না। হয়তো সেই টাকা দিয়ে এমন কোনও শিশুর স্কুলের খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে, যার সঙ্গে আপনার কোনও দিন দেখা হবে না।
কোনও পরিবারের জন্য দেওয়া ভর্তুকিতে আপনার দেওয়া টাকার অংশ থাকতে পারে। আবার এমন কোনও প্রবীণ ব্যক্তির পেনশনেও আপনার দেওয়া অর্থের অংশ থাকতে পারে, যাঁর নাম আপনি কোনও দিন জানবেন না।
এটাই সরকারি টাকার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—যিনি টাকা দেন, তিনিই সবসময় সেই টাকার সুবিধা পান না।
একজন তরুণ চাকরিজীবী আজ কর দিলেন। বহু বছর পরে অন্য কোনও ব্যক্তি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেন ওই খরচেই। একজন দোকানদার কর ব্যবস্থায় নিজের অবদান বা ভাগ জমা করলেন। অন্য কোনও নাগরিকের সন্তান সেই টাকায় সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করল।
শহরের একজন বাসিন্দার দেওয়া করের অর্থ এমন কোনও জেলার পরিষেবা তৈরিতে কাজে লাগতে পারে, যেখানে তিনি জীবনে কখনও পা রাখেননি।
এই যোগসূত্রগুলি আমরা সাধারণত দেখতে পাই না। আর সেই কারণেই হয়তো সরকারি টাকা অনেক সময় আমাদের কাছে অন্য কারও টাকা বলে মনে হয়। কিন্তু আসলে তা নয়। সরকারি টাকা খরচেরও নিয়ম রয়েছে। আর এখানেই সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আইনের অধিকার বা অনুমোদন ছাড়া কোনও কর আদায় করা যায় না। একইভাবে সরকারি অর্থও ইচ্ছেমতো খরচ করা যায় না। সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সরকারি অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করা হয়।
এর পিছনে মূল ধারণাটি সহজ—জনগণের টাকা জনস্বার্থেই ব্যবহার করতে হবে।
এবার নিজের পকেটের ১০০ টাকার কথা ভাবুন।
আপনি সেই টাকা খরচ করে যদি কিছুই না পান, তাহলে নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবেন। দোকানদার বেশি দাম নিলে সেটাও আপনার চোখে পড়বে।
তাহলে টাকা যখন সরকারি অর্থে পরিণত হয়, তখন আমাদের সেই প্রশ্ন করার অভ্যাসটা কেন কমে যায়?
সরকারকে অবিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। আবার চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করারও প্রয়োজন নেই।
এর মাঝখানে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সচেতন থাকা।
এই প্রশ্নগুলি শুধু অর্থনীতিবিদদের জন্য নয়। একজন কৃষক প্রশ্ন করতে পারেন। একজন ছাত্র প্রশ্ন করতে পারেন। দোকানদার, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কলেজ পড়ুয়া- সকলেই প্রশ্ন করতে পারেন।
এমনকী রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে বসা সেই ছোট ছেলেটিও প্রথম প্রশ্নটা দিয়ে শুরু করতে পারে—
“টাকাটা কোথায় যায়?”
হয়তো সে নিজেই জানে না, কত বড় একটি প্রশ্ন সে করছে।
নাগরিকত্ব শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকত্বের অর্থ শুধু ভোটের সময় ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নয়।দেশটা এমন কিছু নয়, যা অন্য কেউ চালায় আর আমরা শুধু বাইরে থেকে দেখি। দেশ একটি যৌথ বাড়ি, যেখানে আমরা সবাই বাস করি। রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল, পেনশন, ভর্তুকি- এগুলি অন্য কারোর বিষয় নয়। এগুলি আমাদের সবার সঙ্গে জড়িত। আর এগুলি চালানোর জন্য যে টাকা খরচ হয়, সেটাও আমাদের সবার টাকা।
আমরা নিজেদের টাকা খুব হিসাব করে খরচ করি। তাই যে টাকা আর আমাদের পকেটে নেই, সেই টাকাটাও কোথায় যাচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। তবে সেই নজরদারি যেন সন্দেহ থেকে নয়, দায়িত্ববোধ থেকে হয়।কারণ আপনার পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে সরকারি ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাওয়ার পর আপনার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
গণতন্ত্রে, বরং সেখান থেকেই সেই দায়িত্ব শুরু হয়।