
কলকাতা: স্বামী একতরফাভাবে বিবাহবিচ্ছেদ (ডিভোর্স) পেলেও স্ত্রীর খোরপোষ (Maintenance) পাওয়ার আইনি অধিকার বাতিল হয়ে যায় না—সম্প্রতি এক মামলায় স্পষ্ট জানিয়ে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে স্ত্রী পুনর্বিবাহ না করা পর্যন্তই এই অধিকার বহাল থাকবে। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে যে, শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা না থাকলে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত সন্তান (বিশেষত কন্যা) সিআরপিসির ১২৫ ধারায় খোরপোষ দাবি করতে পারে না।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি উদয় কুমার, সমর পাল নামে এক ব্যক্তির দায়ের করা রিভিশন আবেদন আংশিক মঞ্জুর করে এই পর্যবেক্ষণ জানান।
মামলার প্রেক্ষাপট
হাওড়ার উলুবেড়িয়ার বাসিন্দা সমর পাল ও জ্যোৎস্না পাল। তাঁরা ১৯৯৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বিয়ে করেছিলেন। বর্তমানে তাঁদের দুই সন্তান রয়েছে। ১৯৯৬ সালে তাঁদের ছেলে জন্মায় ও ১৯৯৯ সালে তাঁদের মেয়ে। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁদের দাম্পত্যজীবনে অশান্তি শুরু হয়। ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই জ্যোৎস্না তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেন। তাঁর বিরুদ্ধে শারীরিক নিগ্রহ ও অ্যাসিড হামলার অভিযোগ আনেন। ২০২২ সালের ২০ জুন তাঁদের ডিভোর্স হয়। এরপর স্ত্রী মাসে ৩৫০০ হাজার খরপোষ দাবি করেন। ১৫০০ নিজের জন্য ও ২০০০ তার মেয়ের জন্য। জল ফের গড়ায় আদালত।
কারা খোরপোষের অধিকারী: বিবাহবিচ্ছেদের পর স্ত্রীর দায়ের করা খোরপোষের মামলা সম্পূর্ণ খারিজ করার দাবি নিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন স্বামী। তবে বিচারপতি কুমার জানান, সিআরপিসির ১২৫(১) ধারার আইনি অনুযায়ী ‘স্ত্রী’ শব্দের মধ্যে তালাকপ্রাপ্ত নারীও অন্তর্ভুক্ত। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়ের ভিত্তিতে আদালত মন্তব্য করে, স্বামীর মতে ডিভোর্স হয়ে গেলেও প্রাক্তন স্ত্রীকে খোরপোষ দেওয়া তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব।
প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার দাবি খারিজ: স্ত্রীর অধিকার বহাল রাখলেও, প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার খোরপোষের দাবি খারিজ করে দিয়েছে আদালত। এই মামলার ক্ষেত্রে, সমর পালের মেয়ে ২০১৯ সালে আবেদন জানানোর আগেই ২০১৭ সালে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। আইন অনুযায়ী, কেবল শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানই সিআরপিসি ১২৫ ধারায় খোরপোষ পাওয়ার যোগ্য। ফলে আদালত পর্যবেক্ষণ জানায়, খরপোষের ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তির শারীরিকভাবে সক্ষম সাবালক কন্যা অন্তর্ভুক্ত হবে না।
অন্যান্য আইনি পথ খোলা: তবে একটি পথ খোলা। হিন্দু অ্যাডাপশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অ্যাক্টের ২০(৩) ধারায় সিভিল কোর্টের মাধ্যমে ওই কন্যা পৃথক আইনি প্রতিকার বা খোরপোষ চাইতে পারেন বলে আদালত স্পষ্ট করে।
আর্থিক সামর্থ্য ও ওয়ারেন্ট স্থগিত: আর্থিক সামর্থ্য সংক্রান্ত বিরোধের চূড়ান্ত বিচারের দায়িত্ব ট্রায়াল কোর্টের ওপর ছেড়ে দিয়েছে হাইকোর্ট। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, মোট বকেয়া টাকার ৫০ শতাংশ জমা দিলে স্বামীর বিরুদ্ধে জারি হওয়া ডিস্ট্রেস ওয়ারেন্ট স্থগিত থাকবে। বকেয়া আদায়ের আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আদালতের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, আইন কখনও ‘blind, punitive tool’ হতে পারে না।