
ডালহৌসি চত্বরের লালদিঘির পাড়ে আজও মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই লাল ইমারৎ। আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যা বাংলার বিপ্লব, ব্রিটিশ আস্ফালন আর রাজনৈতিক পালাবদলের নীরব সাক্ষী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস যার প্রতিটি ইটে গাঁথা, সেই রাইটার্স বিল্ডিংস বা মহাকরণ সেজে উঠেছে গেরুয়া রঙের আলোকসজ্জায়। তবে, ২০১১ সালে বাংলার মসনদে তৃণমূল সরকার আসার পর, প্রশাসনিক কেন্দ্র ‘নবান্ন’-এ স্থানান্তরিত হয়ে যায়। তারপর থেকে এই ঐতিহাসিক ভবনের ব্যস্ততা ফিকে হয়ে গিয়েছিল। তবে সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবহে ফের চর্চায় উঠে এসেছে এই ধ্রুপদী স্থাপত্য। এই লাল ইমারতের দেওয়ালে পড়েছে নতুন রঙের পোচ, জ্বলে উঠেছে গেরুয়া রঙের আলো।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরণ কেবল একটি প্রশাসনিক ভবন নয়, বরং এটি ছিল বামপন্থী শাসনের অবিচ্ছেদ্য কেন্দ্রস্থল। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এই ঐতিহাসিক ইমারৎ থেকেই দীর্ঘসময় পরিচালিত হয়েছিল রাজ্যের ভাগ্যলিপি। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মহাকরণ কার্যত রাজ্যের প্রধান সচিবালয় এবং শাসনের স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই আড়াইশো বছরের প্রাচীন ভবনের অন্দরেই নেওয়া হয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। জ্যোতি বসুর দীর্ঘ মেয়াদী শাসনকাল থেকে শুরু করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জমানা— রাইটার্স বিল্ডিংয়ের অলিন্দেই প্রতিধ্বনিত হতো বামপন্থী রাজনীতির মূল সুর। কিন্তু জানেন কি কেন এই বিল্ডিংয়ের নাম রাইটার্স? ব্রিটিশ আমলে কেন তৈরি হয়েছিল এই বিল্ডিং?
সালটা ১৭৭০। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইউরোপীয় কেরানিদের বসবাসের জন্য এই ভবনের নকশা তৈরি করেছিলেন টমাস লিয়ন্স। প্রায় ১৭ বিঘা জমির ওপর উনিশটি পৃথক অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে গড়ে ওঠা এই চত্বরটি কেরানিদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেকালে কলকাতার প্রথম তিনতলা ভবন হিসেবে এটি ছিল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। গথিক ও করিন্থীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণে এর সামনের অংশটি বর্তমান রূপ পায়।
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর, বিপ্লবী সংগঠন ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’-এর তিন অকুতোভয় সদস্য— বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই দিনটি ছিল রক্তে ভরা। ইউরোপীয় পোশাকে সজ্জিত এই বিপ্লবীদের সঙ্গে ছিল লোড করা রিভলভার। ভবনে প্রবেশ করেই তাঁরা কুখ্যাত ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ কর্নেল এন. এস. সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন, যিনি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিলেন।
সিম্পসনকে হত্যার পর তাঁরা ভবনটি দখল করে নেন এবং অচিরেই রাইটার্স-এর অলিন্দে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধ। পুলিশের বিশাল বাহিনীর সামনে এই তিন বিপ্লবী একসময় কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অনিচ্ছুক বাদল গুপ্ত তৎক্ষণাৎ পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মবলিদান দেন, অন্যদিকে বিনয় ও দীনেশ নিজেদের ওপর গুলি চালান। পাঁচ দিন পর হাসপাতালে বিনয় বসুর মৃত্যু হয়, কিন্তু দীনেশ বেঁচে ফেরেন এবং পরবর্তীতে ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই তাঁর ফাঁসি হয়। আজ এই মহান তিন বিপ্লবীর স্মরণে ডালহৌসি স্কোয়ারের নামকরণ করা হয়েছে ‘বিবাদী বাগ’ (বি.বি.ডি. বাগ)। রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনে বিনয়, বাদল ও দীনেশের একটি স্মারক মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় দলনেতা বিনয় তাঁর দুই সহযোদ্ধাকে জীবনের শেষ যুদ্ধের পথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এর পিছনে রয়েছে এক চমৎকার কাহিনি। আঠারো শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেব কেরানিরা খাগের কলমে দিনভর সরকারি নথিপত্র ও দলিলের প্রতিলিপি তৈরি করতেন। তৎকালীন সময়ে এই লিপিকার বা কেরানিদের বলা হতো ‘রাইটার’। তাঁদের আবাসন ও কর্মস্থল হিসেবেই ভবনটির নাম হয়ে যায় ‘রাইটার্স বিল্ডিং’। ১৮০০ সালের পর থেকে এটি পুরোদস্তুর প্রশাসনিক ভবনে রূপান্তরিত হয়।
বাংলার নতুন সরকার যদি ফের এই ঐতিহ্যের অলিন্দ থেকে কাজ শুরু করে, তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মহাকরণের করিডোরে ফিরবে আমজনতার ভিড় আর প্রশাসনের কর্মব্যস্ততা। ইতিহাসের পাতা উল্টে রাইটার্স বিল্ডিং ফের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, যেখান থেকে সরকার চালাবে বাংলার নতুন বিজেপি সরকার।