
কলকাতা: কালীঘাট মন্দিরে (Kalighat Temple) দেবীর গয়না কোথায়? মূল্যবান সামগ্রীও বা কোথায়? প্রায় চার দশক ধরে খোঁজ নেই মন্দিরের ধন-রত্নের। এমনই অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার। কলকাতার প্রাচীন জমিদার পরিবারের অভিযোগ, ১৯৮০ সাল থেকে দেবীর গয়না ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ গচ্ছিত লকারের চাবি পাওয়া যাচ্ছে না। কী পরিস্থিতিতে রয়েছে ধন-সম্পদ, আদৌ তা ঠিকঠাক রয়েছে কি না, এমনই সব প্রশ্ন তুলে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা বিচারকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী ফ্যামিলি কাউন্সিল। জানা গিয়েছে, জেলা বিচারক পদাধিকার সূত্রে কালীঘাট মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান। তাই তাঁর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। জমিদার পরিবারের দাবি, বছরের পর বছর ধরে দেবীর গয়না ও মন্দিরের অন্যান্য সম্পত্তির যথাযথ হিসাব হয়নি।
সাবর্ণ রায়চৌধুরী ফ্যামিলি কাউন্সিলের সম্পাদক দেবর্ষি রায়চৌধুরীর দাবি, দেবীর সম্পত্তি ও গয়না সংরক্ষণের জন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে লকার রয়েছে। কিন্তু সেই লকারের চাবি ১৯৮০ সাল থেকেই পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের আরও অভিযোগ, মন্দিরের সম্পত্তির হিসাব রাখার দায়িত্বে থাকা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ হিসাবও হয়নি। মন্দিরের সম্পত্তি নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন। এর ফলে ভক্তদের আস্থা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
দীর্ঘদিন ধরে লকারের চাবির খোঁজ না পাওয়া, মন্দিরের সম্পত্তির ক্ষতি বা তছরুপের অভিযোগে অবিলম্বে এফআইআর-এর নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে জেলা বিচারকের কাছে।
জেলা বিচারকের কাছে দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে কালীঘাট মন্দির কমিটির নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়ার কথা। কমিটিতে পাঁচজন নির্বাচিত এবং ছয়জন বাইরের সদস্য থাকার কথা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা বিচারক ওই কমিটির চেয়ারম্যান।
ট্রেডার্স কাউন্সিলের প্রতিনিধিত্ব থাকার কথাও বলা হয়েছে। অভিযোগ, কাউন্সিলের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পপতির মৃত্যুর পর মন্দির প্রশাসনের তরফে তাঁদের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ করা হয়নি। ভক্তদের দেওয়া দানের উপর নজরদারির জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দফতরকে কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও বাস্তবে একাধিক নিয়ম লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
কালীঘাট মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৬ সালেও কলকাতা হাইকোর্টে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। সেই সময় পরিস্থিতি নিয়ে মন্দিরের তৎকালীন চেয়ারম্যান তথা জেলা বিচারক উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল, মন্দিরে যে পরিমাণ প্রণামী জমা পড়ার কথা, তা জমা পড়ছিল না। এমনকী, পুজোর ‘স্লট’ বহিরাগতদের কাছে বিক্রি করার অভিযোগও উঠেছিল।
মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ কল্যাণ হালদার কমিটির নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দেরির কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পাদকের মৃত্যু এবং চেয়ারম্যান অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকার কারণে প্রক্রিয়ায় দেরি হয়েছে। তবে বর্তমানে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং বিষয়টি জেলা বিচারককে জানানো হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দাবি, ষোড়শ শতক থেকেই কালীঘাটের সঙ্গে তাঁদের যোগ রয়েছে। পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, জিয়া গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী পদ্মাবতী দেবী ১৫৬৯ সালে হালিশহর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। কথিত রয়েছে, ১৫৭০ সালে দেবীর দর্শন পাওয়ার পর জলের নীচ থেকে দেবীর ডান পায়ের আঙুলের অংশ পাওয়া যায় এবং তা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরিবারের দাবি, কালীঘাটের বর্তমান বিগ্রহ তাঁদের কুলদেবী ভুবনেশ্বরীর।