
কলকাতা: নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে গোটা বাংলা যখন তোলপাড়, তার মধ্যে ঘৃতাহুতির কাজ করেছে বৃহস্পতিবারের একটি ঘটনা। হঠাৎ করেই হুগলিতে কয়েকজনের বাড়িতে পৌঁছে গেল নিয়োগপত্র। তাঁদের কারোর বয়স ৬২, কারোর ৬৫। অবসরের বয়স পেরিয়ে কীভাবে নিয়োগপত্র? কিন্তু এটা তো একটা সরকারি প্রসেস! জানা যায়, এই মামলা অনেক দিনের পুরনো। এক-দু’জন নন, সম্প্রতি ৬৬ জনকে নিয়োগপত্র দিয়েছে হুগলির প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ। দেখা গিয়েছে, তাঁদের সকলেরই বয়স ৬০ পেরিয়ে গিয়েছে। চার জন প্রয়াতও হয়েছেন।
এই মামলা কিন্তু বহু পুরনো। সেই বাম আমলের। ১৯৮১ সালের ১২ মার্চ চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেয় হুগলি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ। সে সময়ে প্রশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও চাকরি পাননি ৬৬ জন। প্রশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে ১৯৮৩ সালে মামলা দায়ের করেন কালীধন বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক চাকরিপ্রার্থী। ১৯৯১ সালে ডিভিশন বেঞ্চে রায় হয় সাপ্লিমেন্টারি প্যানেল তৈরি করে যোগ্যদের নাম ঢোকাতে হবে ২ মাসের মধ্যে। সে সময়ে ডিভিশন বেঞ্চের রায়কেই মান্যতা দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এর মধ্যে ঘটে যায় পালাবদল। আরও বেশ কয়েক বছর জল গড়ায় এই টানাপোড়েনেই। ২০১৪ সালের ৮ জানুয়ারি চাকরিপ্রাপকদের নাম স্কুল শিক্ষা কমিশনারের কাছে পাঠায় হুগলি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ।
অভিযোগ, তারপরও কোনও ব্যবস্থা করতে পারেনি শিক্ষা দফতর। এরপর ফের আদালতের দ্বারস্থ হল চাকরিপ্রার্থীরা। ২০১৫ সালের ৯ জানুয়ারি আদালত স্কুল শিক্ষা কমিশনারকে নির্দেশ দেয় ২ সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে। তারপরও কার্যকর হয়নি সিদ্ধান্ত। অবশেষে ২০২৩ সালে ২০ ডিসেম্বর বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চ কড়া নির্দেশ দেন। গত বছরই ২৯ ডিসেম্বর শিক্ষা দফতর হুগলি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদকে আদালতের নির্দেশ ‘কম্প্লাই’ করার কথা বলে। সেই মতো ১০ জানুয়ারি যোগ্যদের চাকরি দেন হুগলি ডিপিএসসি।
গত ২০ ডিসেম্বরের শুনানিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, হুগলির ডিপিএসএসি চেয়ারম্যান শিল্পী নন্দীর ভূমিকাও যথাযোগ্য নয়। মামলাকারী চাকরিপ্রার্থীর দু’জনকেই ২৫ হাজার টাকা করে জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। প্রশ্ন উঠছে, সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও এই চাকরিপ্রার্থীদের চাকরির ক্ষেত্রে কেন কোনও উদ্যোগ হয়নি তৃণমূল আমলে? এ বিষয়ে স্কুল শিক্ষা কমিশনার বল ঠেলেছেন ডিপিএসসি চেয়ারম্যানের ঘরেই।
আগের শুনানিতেই আদালত হুগলির ডিপিএসসি চেয়ারপার্সনকে কাজের ক্ষেত্রে ‘অমনোযোগী’ বলে কটাক্ষও করেছেন। আদালতের নির্দেশ থাকাসত্ত্বেও শিক্ষা দফতর ও ডিপিএসসির গড়িমশিতেই কেটে যায় এত গুলো বছর।
হাইকোর্টে জানিয়ে দেয়, ২০১৪ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে নিয়োগ বিবেচিত হবে। সেই অনুযায়ী মামলাকারী চাকরিপ্রার্থীদের বেতন ও যোগ্য হলে পেনশনও মিলবে। এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবারই হুগলি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারপার্সন শিল্পা নন্দীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘‘এখনই কিছু বলতে পারব না। যা বলার পরে বলব।’’ আর যাঁরা চাকরি পেলেন, তাঁরা কী বলছেন? ষাটের কাছাকাছি বয়স এক ব্যক্তি বললেন, ‘‘দুটো আমল দেখে ফেললাম। তবে চাকরিটা পেলাম এত দেরিতে। জীবনের তো শেষ বয়সে এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলাম। কিন্তু চাকরি পাইনি। পরে প্যানেল বাতিল হয়ে যায়। এখন যখন শিক্ষা সংসদ নিয়োগপত্র পাঠাল, কী করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”