
কলকাতা: প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করেন ট্রেনে। রেললাইনে সামান্য ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিপন্ন হতে পারে লাখো প্রাণ। ভারতীয় রেলে যখনই কোনও বড় রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে দায়ী রেল ট্র্যাকের কোনও সমস্যা। যাত্রী নিরাপত্তায় রেললাইনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার শিয়ালদহে রেললাইনের ত্রুটি খুঁজতে বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হল। রেল লাইনের স্বাস্থ্য খুঁজতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি আল্ট্রাসনিক ফ্ল ডিটেকশন মেশিন (Ultrasonic Flaw Detection Machine) ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই মেশিন শুধুমাত্র পরীক্ষা চলাকালীন ট্র্যাকের স্বাস্থ্য নয়, আগামী তিন মাসের ভবিষ্যৎ কী, অর্থাৎ আগামী তিন মাসের মধ্যে ফাটল বা অন্য কোনও সমস্যা দেখা দিতে পারে কি না, তাও আগাম তথ্য ফুটেজ সহ তুলে ধরছে। ইঞ্জিনিয়াররা রেললাইনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন এই অত্যাধুনিক নয়া মেশিনের মাধ্যমে।
শিয়ালদহে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর যাতায়াত। শিয়ালদহ ডিভিশনের অন্তর্গত মোট ১৩৭৫ ট্র্যাক কিলোমিটার রয়েছে। যার মধ্যে ৭৬১.২৪ কিলোমিটার ট্র্যাক ৬০ কেজি ওজনের এবং বাকি ৬১৩.৭৬ কিমি ট্র্যাক ৫২ কেজি ওজনের।
সেই রেললাইনের কোথাও কোনও সূক্ষ্ম ফাটল বা অভ্যন্তরীণ ত্রুটি রয়েছে কি না, এবার প্রযুক্তির সাহায্যে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ইউএসএফডি (USFD) মেশিন। রেললাইনের ভিতরে থাকা এমন ত্রুটি, যা খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়, তা শনাক্ত করতেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে।
লাইনের পাত এবং মেশিনের মাঝে যাতে কোনরকম সূক্ষ্ম ফাক না রয়ে যায়, তার জন্য মেশিন চলাকালীন উপর দিক থেকে জল দেওয়া হচ্ছে। কারণ কোনও রকম ত্রুটি যাতে না রয়ে যায়, তার জন্য সামান্য বাতাসও মেশিন এবং লাইনের পাতের মাঝখানে রাখা যাবে না।
জানা গিয়েছে, এই মেশিনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ছবি তিন মাসের জন্য সংরক্ষিত করা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারদের পাশাপাশি শীর্ষ আধিকারিকরাও লাইনের থেকে প্রাপ্ত ফুটেজ খতিয়ে দেখার দায়িত্বে থাকছেন।
রেললাইনের নিরাপত্তায় এই ধরনের পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লাইনের উপরিভাগে কোনও সমস্যা চোখে না পড়লেও ভিতরে সূক্ষ্ম ফাটল বা ত্রুটি থাকতে পারে। USFD প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই অভ্যন্তরীণ ত্রুটি শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ত্রুটি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট অংশে পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতির ব্যবস্থা দ্রত করা যায়।
শিয়ালদহের ডিআরএম রাজীব সাক্সেনা বলেন, “রেলের ট্র্যাকে অনেক সময় তাপমাত্রা, ট্রেনের ভার, বাড়া-কমার কারণে লোড তৈরি হয়। এর ফলে রেললাইনে ফাটল ধরতে পারে। এই মেশিন আগে থেকেই সিগন্যাল দিয়ে দেয় যে কোথায় সমস্যা হতে পারে। এটা রেলের ট্র্যাকের এক্স-রে মতো কাজ করে। আগে থেকেই সমস্যা জেনে, সেই অনুযায়ী ট্র্যাকে সংস্কার বা পরিবর্তন করা হয়।”
শিয়ালদহের মতো ব্যস্ত রেলপথে নিয়মিত ট্র্যাক পরীক্ষা তাই যাত্রী নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রেলের লক্ষ্য, সময়মতো লাইনের সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং নিরাপদ ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা।
শিয়ালদহে রেললাইনের এই প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা মূলত নিরাপত্তার স্বার্থেই। খালি চোখে ধরা না পড়া ত্রুটি চিহ্নিত করে আগেভাগেই ব্যবস্থা নেওয়াই লক্ষ্য। অর্থাৎ, দুর্ঘটনার আগে ত্রুটি শনাক্ত করে তা মেরামত—রেললাইনের নিরাপত্তায় প্রযুক্তির এই ব্যবহারই এখন বড় ভরসা।