Bangla NewsKolkata Teachers’ Day 2026: West Bengal CM Suvendu Adhikari Calls for Education Reforms, Backs NCC Revival and Restrictions on Mobile Phones in Schools
Suvendu Adhikari Speech: মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আমরা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক ভুল করে ফেলেছি। ব্রতচারীর মতো শরীর গঠন তার ফিরিয়ে আনার দরকার রয়েছে। আমাদের এখানে এনসিসি তুলে দেওয়া হল। জয় হিন্দ বাহিনী তৈরি করা হল। ভীষণ ক্ষতি। এনসিসি-কে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমরা খেলাধূলার প্রতি নজর দিইনি।"
কলকাতা: শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার নিউটাউনের কনভেশন সেন্টারে বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানেই বক্তৃতা রাখতে গিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। শ্রদ্ধা জানান ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দকে। অনুষ্ঠান থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে কী কী সংস্কার আনার কথা বললেন মুখ্যমন্ত্রী?
শিক্ষাক্ষেত্রে রাধাকৃষ্ণণ, বিদ্যাসাগরের অবদানের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বলেন,” প্রথমেই রাধাকৃষ্ণন সম্পর্কে বলতে হবে। তাঁর জন্মদিনে শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। বিদ্যাসাগর ৩০০-র বেশি বই লিখে গিয়েছেন। সবথেকে বেশি কাজ করেছেন নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য । তিনি যে সংস্কার করে গিয়েছেন, তা আজকের দিনের জন্য প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি।”
শুভেন্দুর কথায়, শিক্ষা কেমন হওয়া উচিত, তা বলে গিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “তাঁর লেখা বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। বেলুড় মঠ ও মিশনে একাধিক বই সংগ্রহ করেছি। শিক্ষা সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, তা আজকের দিনে ভীষণ প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, এমন শিক্ষা চাই, মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিবাদ বিকশিত হয়, বুদ্ধিবৃত্তি বিকশিত হয়। তাই পুঁথিগত শিক্ষার মধ্যে যদি আটকে রাখি, তাহলে ভুল করব।”
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে পুরনো পরিকাঠামোকে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু বলেন,”আমরা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক ভুল করে ফেলেছি। ব্রতচারীর মতো শরীর গঠন তার ফিরিয়ে আনার দরকার রয়েছে। আমাদের এখানে এনসিসি তুলে দেওয়া হল। জয় হিন্দ বাহিনী তৈরি করা হল। ভীষণ ক্ষতি। এনসিসি-কে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমরা খেলাধূলার প্রতি নজর দিইনি। আমি মনে করি, আমি যে জেলা মেদিনীপুর থেকে উঠে এসেছি, সেই জেলা মাধ্যমিকে শতাংশের বিচারে সবসময় প্রথম স্থান হিসেবে উঠে আসে। আমাদের ওই জেলায় ময়না বলে একটা জায়গা রয়েছে। সেখানে আপনি যদি বিদ্যালয়গুলিতে যান, সেই পুরনো লোকেদের তৈরি করা ভাবনায় বড় বড় জমি দিয়ে গিয়েছেন। একেকটা বিদ্যালয়ে প্রেয়ার হল, বিরাট খেলার মাঠ, সাঁতার কাটার জন্য পুকুর, কী নেই সেখানে। ঢুকলেই মনে হবে শান্ত পরিবেশে এলাম। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি, আরেকদিকে বিদ্যাসাগর আবার কোথাও মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি। হলগুলিতে হতো রবীন্দ্র চর্চা। যতরকমের শারীরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল, এগুলো অবহেলিত হয়েছে। এগুলো আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।”
স্কুল ছাত্রছাত্রীদের জীবনে মোবাইল ফোন কতটা ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলছে, তাও মনে করিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। সতর্ক করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,” স্কুল ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয়ঙ্কর কুপ্রভাব মোবাইল ফোনের। খুব কঠিন সিদ্ধান্ত। ভোট কমে যাবে আমার। গুজরাট দেখুন ক্লাস ওয়ান থেকে ১২ ক্লাস পর্যন্ত মোবাইল হাত দিতে দেয় না ছাত্র-ছাত্রীদের। এইসব সংস্কার না করলে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক দিবসের মানে থাকবে না।…তবে কিছু জিনিস রয়েছে যেখানে রাজনীতির লোকেদের ঢোকা উচিত নয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার আনার ক্ষেত্রে একটা বিষয় কম্প্রোমাইজ করা উচিত নয় বলে মনে করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই বিষয়ে তিনি বলেন, “যাঁরা রাষ্ট্রের ভিতরে থেকে রাষ্ট্রের ক্ষতি করে, দেশপ্রেমে প্রশ্ন তোলে, পূর্ণাঙ্গ বন্দেমাতারম গাইতে যাঁদের সমস্যা থাকে, যাঁরা পহেলগাঁওয়ে আক্রমণ হলে প্রতিবাদ করে না, অথচ পাকিস্তানে আক্রমণ হলে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে শিক্ষাসমাজ, রাষ্ট্রবাদী নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।… কত বড় ছিল আমাদের দেশটা ভাবুন। ধীরে ধীরে কাটতে কাটতে কত ছোট হয়েছে।”
বিদ্যালয়কে বিদ্যামন্দির হিসেবে গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারে এটা অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ বলে মনে করছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই বিষয়ে শুভেন্দু বলেন,”সব বিদ্যালয় মিড-ডে মিলের কিচেন গ্যাসে চলবে। বিদ্যুত তো থাকবেই। সোলার প্যানেলে কনভার্ট করুন। পাখার ব্যবস্থা করুন। অ্যাকাওয়াগার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করুন, শৌচালয় দেওয়ার ব্যবস্থা করুন, ছাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচালয়ের ব্যবস্থা করুন। তবলা, সেতার, হারমোনিয়াম, খঞ্জনি, একতারা দিন। লাইব্রেরিগুলি সাজান। খেলার মাঠ সাজিয়ে দিন। সুন্দর করে সাজান। রামকৃষ্ণ মঠের মতো সুন্দর পরিবেশ তৈরি করুন।”
শিক্ষক শব্দের প্রকৃত মর্যাদাকে ফিরিয়ে আনার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ছাত্রছাত্রী তো এল, পড়াবে কে? যে পদ্ধতিতে শিক্ষক শব্দটা অমার্যাদা করা হয়েছে, শিক্ষক শব্দের কত বড় মানে রয়েছে। আমরা এখনও টিচারদের দেখলে যেমন আমি গাড়ি করে যাচ্ছি, উনি টোটো করে যাচ্ছেন। আমার গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে, টোটো পাস করিয়ে দিই। শিক্ষক শব্দের যে মর্যাদা, তার যে ব্যপ্তি, আজ সেই জায়গা কি আছে বলুন? পুনর্নির্মাণের দরকার নেই? সংস্কারের দরকার নেই? অনেক কিছু হারিয়েছি। হারানো জিনিসকে ফেরাতে গেলে উপযুক্ত আচার্য নিয়োগ করতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের অন্যতম ধাপ শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ। তিনি বলেন,”প্রথম বিদ্যামন্দির, দ্বিতীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ। শিক্ষক-শিক্ষিকারা যাতে ভালো করে পড়াতে পারেন, সারাদিন যাতে মিড-ডে মিলের হিসেব না করতে হয়, তার জন্য শিক্ষাকর্মী নিয়োগ করতে হবে। ল্যাবরেটরিতে লোক নিয়োগ করতে হবে, ঘণ্টা বাজানোর লোক নিতে হবে। মিত্র ইনস্টিটিউশনে সাপের কামড়ে ছাত্রকে এসএসকেএম যেতে হয়। কেন জানেন? তিন বছর কম্পোজিট গ্রান্ট পাননি। এটা দিয়েই কার্বলিক অ্যাসিড কেনা হয়। টাকার তো কোনও অভাব ছিল না। খেলা-মেলা, দুর্গাপুজোয় টাকা দেওয়া কোনও কিছুর তো অভাব ছিল না। এগুলো সরকারকে ভাবতে হবে।”
আদালতের নির্দেশ মেনে নিয়োগের বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রীর। শুভেন্দু বলেন, “রামকৃষ্ণ মিশনের বিদ্যালয়গুলির, যাঁরা পরিচালনা করেন, সেই মহারাজরা কি খারাপ কিছু করতে পারেন? যিনি সব ত্যাগ করে এসেছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে যে শিক্ষক আপনারা নিয়োগ করুন। কে আসল শিক্ষক, কে নকল শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী- অভিভাবকরা যখন প্রশ্ন তোলেন, তখন শিক্ষক শব্দের মর্যাদা থাকে না। ভুল থেকেই মানুষ শিক্ষা নেই। জায়গাগুলো অপরিষ্কার ছিল বলেই প্রধানমন্ত্রী স্বচ্ছ ভারত মিশন করছেন।… তিনজন রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ শুধু নন, আইআইএম থেকেও একজনকে সদস্য হিসেবে রেখেছি। আমরা শিক্ষক নিয়োগ করে দেব নিশ্চিন্তে থাকুন। সুপ্রিম কোর্টর নির্দেশ, হাইকোর্টের নির্দেশ মাথায় রেখে করে দেব। কোনও অন্যায় হবে না। আমরা ইতিমধ্যেই বিধানসভায় ওবিসি বিল পরিবর্তন করে দিয়েছি। অন্যায়ভাবে যাদের ওবিসি করা হয়েছিল, তাঁদের বাদ দিয়ে দিয়েছি। ৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট খোলার পরে আমরা কোর্ট থেকে এক্সিট নিয়ে নিয়েছি। এসএসসি তৈরি হয়ে গিয়েছে। আমি বলেছি, মোবাইল ফোনে মেসেজ দিয়ে হয় না। তালিকা প্রকাশ করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও পরীক্ষাই একমাত্র বিচার্য বিষয় হবে। অন্য কিছু দরকার নেই। এত নম্বর মৌখিকে রেখেছেন কেন? নিজের লোক ঢোকাবেন বলে? আমি বলেছি ৫ নম্বরের বেশি থাকা উচিত নয়। পরামর্শ দিয়েছি এসএসসিকে। সংরক্ষণ বিধি মেনেই শিক্ষক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছি।”
শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারে তৃতীয় হচ্ছে আর্থিক সুরক্ষা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ডিএ, এরিয়ারের লড়াই। আদালতের নির্দেশের কারণে বিগত সরকার কিছুটা দিতে বাধ্য হয়েছে। আমরা এসে অনেকটা দিয়েছি।… এরিয়ার দিতে গেলে ১২ হাজার কোটি লাগবে। মালহোত্রা কমিটি যা নির্দেশ দেবে, তাই করব। তার সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের সমগ্র শিক্ষা মিশনের মধ্যে দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।”
সিলেবাসেও বদল হবে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। বলেন, “টাটাকে তাড়ানোর বিষয়টা এক পাতা রয়েছে। আর স্বামী প্রবনানন্দ নিয়ে একটি লাইন থাকবে না? শ্যামা প্রসাদ কীভাবে বাংলা অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। আপনি জানাবেন না নতুন প্রজন্মকে? মাতঙ্গিনী হাজরাকে নিয়ে পুরো পেজ থাকবে না? বন্দে-মাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছি। কিছু জিনিসে সরকার কঠোর। কিছু জিনিসে কম্প্রোমাইজ করবে না সরকার। নানা সংস্কার করতে করতে এগোব।”
মিড-ডে মিল প্রসঙ্গে বলেন, “অনেকে বলেছিলেন যে এরা জোর করে আমাদের নিরামিষ আহার বা সাত্ত্বিক আহার চাপিয়ে দিচ্ছে। আমরা ইসকনের আহার বিতরণ করছি, আলাদা করে সপ্তাহে দুই দিন ডিম দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমরা অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সিলেবাসও তৈরি হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, আজ স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ চালু হল।”
শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দু’টি প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি দু’টো প্রকল্পের ঘোষণা করছি। প্রতি জেলায় দু’টি করে তৈরি হবে সিএমশ্রী ইনস্টিটিউট। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী শ্রী। জহর নবোদয় বিদ্যালয়ের মতো এগুলিতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে মেধাবি ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি করা হবে। এগুলোকে মডেল স্কুলে পরিণত করা হবে। সেরা মানের শিক্ষক, আধুনিক ডিজিট্যাল ল্যাব ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট করে ধরে নিতে পারেন সেন্ট্রাল স্কুল তৈরি করব।”
শুভেন্দু আরও বলেন, “এর বাইরেও উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে সেন্টার অফ এস্কিলেন্স অফ স্পোর্টস। স্পোর্টসের ক্ষেত্রে দু’টি পরিকাঠামোগত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব। সেখানে এসএসসির মাধ্যমে স্পোর্টসের শিক্ষকদের নিয়োগ করে আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগামিদিনে যাতে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকে ভবিষ্যত তৈরি হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁরা অংশগ্রহণ করে, সেই ব্যবস্থাও করব। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের প্রাচীনতম খেলাধুলো যেমন খোখো, হাডুডু, ফুটবল ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে ফিরে আসুক।”