
কলকাতা: ইতিহাস গড়ার পথে রাজ্য়। উত্তরাখণ্ড, গুজরাটের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও চালু হতে চলেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code in West Bengal)। আগামী সোমবার, ২৯ জুন রাজ্যের বিধানসভায় আনা হবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল। কী কী থাকবে এই বিলে, তা নিয়ে এখন থেকেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে। কেন রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার, তার স্বপক্ষে ইতিমধ্যেই একাধিক যুক্তি উঠে এসেছে। অনেকেরই যুক্তি, রাজ্য়ে সকল বাসিন্দার জন্য এক নিয়ম চালু করা দরকার। সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে, সময় এসেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পাশ হওয়ার আগেই জেনে নেওয়া যাক কী এই বিধি বা আইন, কেনই বা বিতর্ক-
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (Uniform Civil Code) হল দেশের সকল সম্প্রদায়ের জন্য এক ও অভিন্ন আইন। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, সন্তান দত্তক ইত্যাদির মতো ব্যক্তিগত বিষয়ের ক্ষেত্রে সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য একটিই আইনের কথা বলা হয়। সহজ কথায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হল এমন একটি আইন, যেখানে ধর্ম নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ এবং সম্পত্তি বণ্টন-সহ ব্যক্তিগত বিষয়গুলিতে একই আইন প্রযোজ্য হবে।
সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির স্বপক্ষে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতের নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি তৈরির চেষ্টা করবে রাষ্ট্র। তবে এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy)-এর অংশ, তাই এটি আদালতে বলবৎ করার মতো বাধ্যতামূলক নয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যান্য নির্দেশমূলক নীতিগুলির তুলনায় অনুচ্ছেদ ৪৪-এর নির্দেশ অনেকটাই দুর্বল।
বর্তমানে ভারতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য আলাদা আলাদা পার্সোনাল ল’ বা ব্যক্তিগত আইন রয়েছে। যেমন—
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি (UCC) চালু হলে এই পৃথক ব্যক্তিগত আইনগুলির বদলে সবার জন্য একটিই দেওয়ানি আইন কার্যকর হবে।
সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মের মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৬-এর খ-তে বলা হয়েছে, প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বা তার কোন শাখা তাদের ধর্মের নিজস্ব বিষয়গুলি পরিচালনা করবে। অনুচ্ছেদ ২৯-এ স্বতন্ত্র সংস্কৃতি সংরক্ষণের অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, অনুচ্ছেদ ২৬-এ দেওয়া অধিকার অন্যান্য মৌলিক অধিকারের অধীন নয়। অর্থাৎ কোনওভাবেই এখানে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সমর্থনে যেমন নানা যুক্তি রয়েছে, তেমনই কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিরোধিতাও রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মতো বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির দেশে সবার জন্য একই দেওয়ানি আইন প্রণয়ন করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
অনেকের মতে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) চালু হলে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব রীতি-নীতি ও ব্যক্তিগত আইনের উপর হস্তক্ষেপ করা হবে, যা সংবিধানের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা-র পরিপন্থী হতে পারে।
কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আশঙ্কা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি-র নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের আইন বা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে সংখ্য়ালঘুদের উপরে।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি-র সমর্থকদের যুক্তি, বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনে নারীদের প্রতি বৈষম্য রয়েছে। একক আইন চালু হলে, নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
ইউসিসি-র সমর্থকদের দাবি, সবার জন্য একই আইন থাকলে, আইনের দৃষ্টিতে সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জাতীয় সংহতি আরও মজবুত হবে।
দেশের মধ্যে উত্তরাখণ্ডে প্রথম অভিন্ন দেওয়ানি চালু হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হয় উত্তরাখণ্ডে। এরপরে গুজরাটেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হয়। অসমে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করতে বিল পাশ হয়েছে ইতিমধ্যে। অন্যদিকে, গোয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মতো গোয়া সিভিল কোড চালু রয়েছে।
অসমে যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আনা হবে, তাতে বিয়ের ন্যূনতম বয়স, পারিবারিক সম্পত্তিতে মহিলাদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।বহুগামিতা সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করা হবে। লিভ ইন সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।বিয়ে ও ডিভোর্সে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হবে বলেই জানিয়েছেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
এবার পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে কী কী বিধান আনা হয়, তাই-ই দেখার।