
কলকাতা: কোটা কি সত্যিই ‘ফ্যাক্টরি’ হয়ে উঠছে? সাফল্যের পিছনে ছুটতে গিয়ে কি মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেছেন পড়ুয়াদের একটি বড় অংশ? যে পরিসংখ্যান উঠে আসছে, তা কিন্তু যথেষ্ট উদ্বেগজনক। শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই কোটায় মৃত্যু হয়েছে ২৩ জন পড়ুয়ার। পড়ুয়াদের আত্মহত্যার রুখতে হস্টেলগুলিতে সিলিং ফ্যানে ‘অ্যান্টি-সুইসাইড ডিভাইস’ লাগানোর নির্দেশ দিয়েছে কোটার প্রশাসন। এই সব সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি থেকেই স্পষ্ট, পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক। এমন অবস্থায় তাই ‘গোড়ায় গন্ডগোল’ সারাতে চাইছে সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার এবার নিয়মের বাঁধনে বাঁধতে চাইছে কোচিং সেন্টারগুলিকে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে কোচিং সেন্টারগুলি। মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলির প্রস্তুতির নামে চলছে দেদার ব্যবসা। এবার এই সব কোচিং সেন্টারগুলির জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক। মাধ্যমিক বা সমতুল্য পরীক্ষায় পাশ কিংবা ১৬ বছর না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ভর্তি নেওয়া যাবে না। স্নাতক পাশ নন, এমন কোনও শিক্ষক রাখা যাবে না কোচিং সেন্টারে। পরীক্ষায় নম্বর কিংবা র্যাঙ্কিং-এর কোনও গ্যারান্টি দেওয়া যাবে না। বছরের মাঝখানে কোচিংয়ের বেতন বাড়ানো যাবে না। মাঝখানে কেউ কোচিং ছেড়ে দিলে সেই পড়ুয়াকে টাকা ফেরত দিতে হবে ১০ দিনের মধ্যে। একদিনে ৫ ঘণ্টার বেশি ক্লাস হবে না। ছুটির পরের দিন পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। খুব ভোরের দিকে বা খুব রাতের দিকে কোচিং ক্লাস রাখা যাবে না। পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
এমন একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি করে সরকারের তরফে কোচিং সেন্টারগুলিকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে, কোনও কোচিং সেন্টার নিয়ম না মানলে প্রথমে জরিমানা করা হবে। তারপরও যদি না শুধরে নেয়, তাহলে পরবর্তী কালে রেজিস্ট্রেশনও বাতিল হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে শিক্ষামন্ত্রক।
কোচিং সেন্টারের মালিকদের একাংশও কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। কলকাতার এক কোচিং সেন্টারের মালিক কামাল হোসেনও বলছেন, যে সব কোচিং সেন্টার এই গাইডলাইনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবে না, সেগুলির অবশ্যই বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত। নাহলে, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কই শেষ হয়ে যাবে। তাঁর মতে, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক চিরকাল বেঁচে থাকবে, পাঠদানের উপর ও ব্যবহারের উপর। ফি-এর জন্য পড়ুয়াদের উপর কোচিং সেন্টার থেকে চাপ দেওয়াও একেবারে অনুচিত বলে মনে করছেন তিনি।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা নন্দিনী মুখোপাধ্যায় অবশ্য কোচিং সেন্টার ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। তাঁর মতে, গাইডলাইন দিয়ে কী হবে? আদৌ এই কোচিং সেন্টারগুলি কেন চলবে? কোচিং সেন্টার থাকলেই তারা মানসিক চাপ তৈরি করবে পড়ুয়াদের উপর। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার একদিকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কোচিং সেন্টারগুলির জন্য গাইডলাইন তৈরি করে আসলে বেসরকারিকরণে উৎসাহ দিচ্ছে। এসব কোচিং সেন্টার থাকাই উচিত নয়। বাচ্চাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য স্কুলের দায়িত্ব অনেক বেশি। সেখানে কেন কোচিং সেন্টারগুলিকে এতটা উৎসাহিত করা হবে? কেন এগুলি এত রমরমা অবস্থায় চলবে?’