
আরশোলা (Cockroach) শব্দটা শুনলেই অনেক বীরপুরুষদেরও বুক দুরুদুরু করতে শুরু করে। বিশেষ করে যখন ডানা মেলে সে সটান উড়ে এসে গায়ে বসতে চায়, তখন ড্রয়িংরুমের সোফার কোনটাই মনে হয় একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল। রান্নাঘর থেকে বাথরুম, সবচেয়ে দীর্ঘজীবী এই জীবটি কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। কখনও আলমারির ফাঁকে, কখনও বা বইয়ের তাকে এর দেখা মিলবেই। যাকে আমরা ভালোবেসে বা ভয়ে ‘আরশোলা’ বলি, তাকে একটু কর্পোরেট সম্মান দিতে গিয়ে আবার ‘ককরোচ’ বলেও ডাকি। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই বিশ্বনাগরিকের কত বিচিত্র এবং মজাদার নাম রয়েছে?
শুরু করা যাক ইংরেজি ‘ককরোচ’ (Cockroach) দিয়ে। এটি কিন্তু খাঁটি ইংরেজি নয়, এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘কুকারাচা’ (Cucaracha) থেকে। আবার হিন্দি, উর্দু এবং পাঞ্জাবি বলয়ে এর নাম শুনলে মনে হবে জিভে জল আনা কোনও স্ট্রিট ফুড,‘তিলচট্টা’ তেল বা তিল চেটে খায় বলেই বোধহয় এই নামকরণ! উত্তর ভারত কাঁপিয়ে এই নাম এখন পুরো হিট। অন্যদিকে মারাঠিতে তাকে ডাকা হয় ‘ঝুরল’ নামে, যা শুনলে মনে হয় কোনও ধ্রুপদী সঙ্গীতের আলাপ চলছে। আর গুজরাটিরা একে ডাকে ‘ভান্দো’ বলে। তা, বাড়িতে উড়ন্ত আরশোলা দেখলে তাকে বন্দনা করার সাধ কারই বা জাগে বলুন! যদিও কেউ কেউ আবার একেবারেই এই জীবটিকে পাত্তা দেননা। আবার কেউ চটি দিয়ে না চেপটে দেওয়া পর্যন্ত থামেননা।
আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা এবং অসমে অবশ্য এই নিয়ে কোনও বিবাদ নেই। ওড়িয়ায় ‘আরশোলা’ আর অসমীয়াতে ‘আরশোলা’—একেবারে একই সুর, একই আবেগ। তবে দক্ষিণ ভারতে গেলেই আরশোলার নাম শুনলে মনে হবে কোনও হাই-ভোল্টেজ দক্ষিণী অ্যাকশন ছবির ভিলেনের পরিচয় দেওয়া হচ্ছে। তামিল ভাষায় এর নাম ‘করাপ্পান পুচ্চি’, তেলুগুতে ‘বোদ্ধিঙ্কা’, কন্নড়ে ‘জিরালে’ আর মালয়ালমে একে ডাকা হয় ‘পাট্টা’ নামে। রান্নাঘরে হঠাৎ এদের দেখলে ভয়ে মানুষের জিভ আড়ষ্ট হতে বাধ্য!
সবচেয়ে বিচিত্র বিষয় হল এর সংস্কৃত নাম। দেবভাষায় একে বলা হয় ‘কর্কটকীট’। প্রাচীন শাস্ত্রীয় গ্রন্থে অবশ্য এর আরও কিছু গাম্ভীর্যপূর্ণ নাম পাওয়া গিয়েছে। রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে বসে থাকা এই নগণ্য প্রাণীর এমন রাজকীয় সংস্কৃত নাম ভাবা যায়! বাংলার ‘আরশোলা’ শব্দের উৎস নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে যতই মতভেদ থাকুক না কেন, একটা বিষয়ে সবাই একমত, নাম যাই হোক, তার উড়ন্ত অবতারের সামনে নামজাদা তারকা থেকে শুরু করে পাড়ার মস্তান, সবাই কুপোকাত। তাই মাঝে মাঝে আপনার ঘরের কোণের সেই ‘কর্কটকীট’ বা ‘তিলচট্টা’কে অন্য নামে ডেকে একপ্রস্থ সম্মান জানাতেই পারেন!