
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি এবং তার সঙ্গে মানুষের রীতিনীতি ও জীবনযাত্রা যেভাবে তার নিজের রূপ পরিবর্তন করে, তারই নিদর্শন পাবেন মোটরসাইকেল ডায়েরির এই পর্বে। শীতকালে আমরা বেশ কিছু পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছি। তাই চলুন বসন্তের এই সময় আমরা হারিয়ে যাই প্রকৃতি এবং তার রূপের মাদকতায়। যেখানে আপনি পাবেন লালমাটি, সবুজ পাহাড় আর পলাশের বন। গত তিন সপ্তাহ ধরে পুরুলিয়ার এবং বাঁকুড়ার বেশ কিছু জায়গা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। একটি জায়গা যেটা না বললেই নয় তারই বিবরণ এই পর্বে আপনারা পাবেন। প্রকৃতি যেন বসন্তকে তার নিজের রং ও রূপ দিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এই সুন্দর প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছেন মানুষেরও নানা উৎসব। আর আঞ্চলিক উৎসবে মেতে নিজের বাইককে ভাল করে সার্ভিসিং করে চলুন বেরিয়ে আসি বেশ কিছু অফবিট স্থানে। শীত থেকে বসন্ত এই সময়টায় পশ্চিমের জেলাগুলি যেন সুন্দরী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ফাগুনের হাওয়া লাগলেই রুক্ষ-শুষ্ক পুরুলিয়ার আকাশে বাতাসে রং ধরতে শুরু করে। ছুটি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন। অপেক্ষা করছে শাল-পিয়ালের জঙ্গলে ঢাকা পুরুলিয়া। পুরুলিয়া মানেই কেবল শাল, পিয়ালের জঙ্গল নয়। রঙিন পলাশও রয়েছে। পলাশের মরশুমের শুরুতেই পুরুলিয়াতে প্রচুর পর্যটকের আগমন হয়। পুরুলিয়া পথে ঘাটে যেন আগুন লাগে যায় সেই লাল পলাশ।
মোটরসাইকেল ডায়েরির একটি পর্বে আমি মাথাবুরু হিল, মাথাবুরু ক্যাম্পিং সাইট, দ্য গ্রেট বান্যান ট্রি, মুররাবুরু হিল, পাতালঘরের মতো সুন্দর-সুন্দর ক্যাম্পিং সাইট এবং অরণ্য সংরক্ষণ এরিয়া নিয়ে আলোচনা করেছি। তাই চলুন এই পর্বে প্রকৃতির রূপ অন্বেষণে আর পলাশের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে পুরুলিয়ার এই অংশে । তাই চলুন আর সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়ি আজকের দিনের প্রথম গন্তব্য স্থান মাথাবুরু হিলের উদ্দেশ্যে ।
চলুন মোটরসাইকেলে লাগেজ বেঁধে নিয়ে (কীভাবে প্যাকিং করবেন তার বিস্তারিত বিবরণ আছে মোটরসাইকেল ডায়েরির ১২ নম্বর পর্বে) কিছু শুকনো খাবার, কিছু এনার্জি বার, কিছু সাধারণ ওষুধ, আর আপনার অতিপ্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী মধ্যে বাইকের পাংচার কিট ও হাওয়া দেওয়ার মেশিন নিতে ভুলবেন না। পুরুলিয়ার বেশ কিছু রাস্তা এখনও ভাল নয়। আর জঙ্গল এবং পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ফলে গাছের কাঁটায় পাংচার হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। আর এক লিটারের জলের বোতল আর ক্যামেরা। এসব গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন কলকাতা থেকে মাত্র ৩০০ কিলোমিটার দূরে মাথাবুরু হিলের উদ্দেশ্যে। NH6 ধরে কোলাঘাট, মেদিনীপুর, বেলপাহাড়ি, ঝিলিমিলি, বান্দোয়ান, বড়বাজার ক্রস করে বাদিক নিয়ে বলরামপুর এবং চলে আসুন আজকের দিনের প্রথম গন্তব্য স্থান মাথাবুরু হিলে। কলকাতা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৩০০ কিলোমিটার, এই জায়গায় আসতে আপনার প্রায় ছয় থেকে সাড়ে ছয় ঘন্টা সময় লেগে যাবে। মাঝে অবশ্যই বাইকের বিশ্রাম এবং খাওয়া-দাওয়া তো আছেই। ভোরবেলা কলকাতা থেকে বেড়ানো দরুন আপনার সময় একটু কমই লাগবে। রাস্তা সব মিলিয়ে বেশ ভাল এবং এত সুন্দর প্রকৃতির মাঝে আপনার এই ছ’ঘণ্টার কষ্ট মনেই হবে না। মাঝে ঝিলিমিলি এবং বেলপাহাড়ির মতন সুন্দর জায়গা তো আছেই।
পুরুলিয়া মানেই কিন্তু শুধু অযোধ্যা নয়। রয়েছে আরও অনেক কিছু এই অযোধ্যা পাহাড়ের কাছেই রয়েছে মাথাবুরু। একেবারেই আদিবাসী এলাকা। এখানে গড়ে উঠেছে একটি অফবিট পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দের সবরকম ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। একেবারে পাঁচতারা মাপের রিসর্ট রয়েছে এখানে।পাহাড়ের কোলে সুইমিং পুল, সবুজ ঘাসের লন থেকে শুরু করে একাধিক সুবিধা রয়েছে সেই রিসর্টে। তার সঙ্গে খাবার তো ঢালাও। আবার বন ফায়ারের বন্দোবস্তও রয়েছে। সন্ধে নামলেই বাইরের লন্ডে বন ফায়ার সঙ্গে হালকা মিউজিক একেবারে জমে যাবে। আবার চাইলে এখান থেকে নানা জায়গায় ট্যুর করতে পারেন। নেচার ট্যুর, বার্ড ওয়াচিংয়ের সুবিধা রয়েছে। মাথাবুরুর জঙ্গলে এই সময় নাম না জানা অনেক পাখি ভিড় করে। যাঁরা পাখি দেখতে ভালোবাসেন তাঁদের জন্য সেরা জায়গা এটি তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এরপরই রয়েছে সুন্দর একটি ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড। দূরে ছোট পাহাড়ের নিচে চারপাশে সবুজ জঙ্গলের মাঝে একটি বিশাল গাছ। দ্য গ্রেট বন্যান ট্রি। পাহাড়ের মাঝে এই কাজটি অদ্ভুত সুন্দর, এই গাছটিকে দেখার জন্য বহু পর্যটকের আগমন হয়। এছাড়াও মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে রাত্রি নিবাসের জন্য রয়েছে অদ্ভুত একটা ঠিকানা যার নাম পাতালঘর। ইংলিশ সিনেমা ‘দা লর্ড অফ দ্যা রিং’ এর একটি চরিত্র ফ্রডো,তাদের মত বাড়িঘর। এছাড়াও রয়েছে প্যারডি ড্যাম। পাতালঘর থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এইডামটি। এখানে না আসলে বোঝাই যায় না পুরুলিয়ার মধ্যে একটি পাহাড়ে ঘেরা জলধারা এবং চারপাশে গভীর জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত একটি সুন্দর ড্যাম। পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি ড্যামে পড়ে এক অবর্ণনীয় রূপ ধারণ করে। যা দেখার জন্য আপনি বারবার ফিরে আসবেন। এর একপাশে ইকোপার্ক যাতে ফুটে উঠেছে নানা ধরনের ফুলের বাহার এবং চারপাশে পলাশের বন, সবুজ প্রকৃতির মাঝে লালের আভা আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে।
এই সুন্দর প্রকৃতিকে ক্যামেরাবন্দি করে চলে আসুন একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপরে, যেখান থেকে দেখতে পারবেন পুরো প্রকৃতির ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। নাম গর্গাবুরু হিল। রক ক্লাইম্বিং জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। এই পাহাড়ের উপর থেকে ড্যামটিকে আরো সুন্দর লাগে। আগামিকাল দোল উৎসব তাই পুরুলিয়া এই সমস্ত স্থান দোলে আরো সুন্দর হয়ে ওঠে, তাই দু-তিন দিন হাতে সময় নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন এই সব স্থানে।