
রাতের আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, তারার পরেও যেন রয়েছে এক অন্তহীন অন্ধকার। যত দূর দেখা যায়, তার পরেই শুরু হয় আরও অজানা এক জগৎ। তাই মানুষের মনে বহুদিনের প্রশ্ন—মহাবিশ্বের কি আদৌ কোনও শেষ সীমানা রয়েছে? আর থাকলে, আলোর গতিতে ছুটে কি সেখানে পৌঁছানো সম্ভব?
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। বরং মহাবিশ্বের প্রকৃতি এবং তার ক্রমাগত প্রসারণের কারণে এই প্রশ্নের উত্তর বেশ জটিল।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। আমরা এমন আলোও দেখতে পাই, যা প্রায় ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন বছর আগে তার যাত্রা শুরু করেছিল। অর্থাৎ, দূরের মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করার অর্থ অনেকটা মহাবিশ্বের অতীতের দিকে তাকানো।
তবে এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আলো এত বছর ধরে ভ্রমণ করেছে বলেই সেই আলোর উৎস আজও আমাদের থেকে একই দূরত্বে রয়েছে—এমনটা নয়। কারণ আলো যখন মহাকাশ পেরিয়ে আমাদের কাছে এসেছে, সেই সময়ের মধ্যেই মহাবিশ্ব নিজেই প্রসারিত হয়েছে। ফলে যে অঞ্চল থেকে সেই প্রাচীন আলো বেরিয়েছিল, সেটি বর্তমানে আমাদের থেকে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। সেই কারণেই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ বলে ধরা হয়।
দৃশ্যমান মহাবিশ্বই কি শেষ?
বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা যতটা মহাবিশ্ব দেখতে পাই, সেটিই গোটা মহাবিশ্বের শেষ নয়। সেটি আসলে আমাদের পর্যবেক্ষণের সীমা। মহাবিশ্বের আরও অনেক দূরের অংশ থাকতে পারে, যার আলো এখনও পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়নি।
আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। এই গতিকেই মহাবিশ্বে তথ্য বা বস্তুর চলাচলের সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের প্রসারণের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। মহাকাশ নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। ফলে অত্যন্ত দূরের গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে এমন হারে দূরে সরে যেতে পারে, যা আলোর গতির চেয়েও বেশি বলে মনে হয়।
এর অর্থ এই নয় যে ওই গ্যালাক্সিগুলো নিজেরা আলোর চেয়ে দ্রুত ছুটছে। বরং তাদের মধ্যবর্তী স্থানই প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সঙ্গে এর কোনও বিরোধ নেই।
আলোর গতিতে ছুটলেও সমস্যা কোথায়?
ধরা যাক, কোনও কাল্পনিক মহাকাশযানকে আলোর গতিতে চালানো সম্ভব হল। ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের কোনও অঞ্চলে পৌঁছাতে পৃথিবীর হিসাব অনুযায়ী সময় লাগবে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন বছর। আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকাশযানের যাত্রীদের কাছে সময়ের প্রবাহ অবশ্য অনেক ধীর হতে পারে, বিশেষ করে গতি আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছালে।
কিন্তু মূল বাধা সময় নয়। সমস্যা হল মহাবিশ্বের প্রসারণ। এই প্রসারণ আবার ক্রমশ দ্রুত হচ্ছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। এর পেছনে যে রহস্যময় শক্তির ভূমিকা রয়েছে, তাকে বলা হয় ডার্ক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি। এর প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।
ফলে এমন কিছু মহাজাগতিক অঞ্চল রয়েছে, যেখান থেকে আলো আজ পৃথিবীর দিকে রওনা দিলেও ভবিষ্যতে তা আমাদের কাছে পৌঁছাতে নাও পারে। কারণ সেই অঞ্চল এবং আমাদের মধ্যকার স্থান এত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে যে আলোও সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারছে না।
রয়েছে ‘মহাজাগতিক ঘটনা দিগন্ত’
এই সীমাকে বিজ্ঞানীরা ‘কসমিক ইভেন্ট হরাইজন’ বা মহাজাগতিক ঘটনা দিগন্ত বলে থাকেন। কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের মতোই এর ওপারের অঞ্চল থেকে তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
অর্থাৎ, মহাবিশ্বের যে অংশ বর্তমানে আমাদের পর্যবেক্ষণের বাইরে, তার সবটাই ভবিষ্যতে আমাদের কাছে দৃশ্যমান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে কিছু অঞ্চল চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে থেকে যেতে পারে।
মানুষের তৈরি মহাকাশযানের বর্তমান গতি এই মহাজাগতিক দূরত্বের তুলনায় অত্যন্ত কম। ভয়েজার-১ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুটলেও নিকটতম নক্ষত্রে পৌঁছাতেই সময় লাগবে প্রায় ৭০ হাজার বছর।
তাই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে যতই উন্নত হোক, মহাবিশ্বের ‘শেষ প্রান্তে’ পৌঁছে যাওয়া যে অত্যন্ত কঠিন—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বরং বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্বের এমন কোনও চূড়ান্ত কিনারা থাকলেও সেটিকে ছুঁয়ে ফেলা মানুষের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
মহাবিশ্বের শেষ কোথায়, আদৌ কোনও শেষ আছে কি না—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনও অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, মহাবিশ্বকে জানার ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিসীমা যতই প্রসারিত হোক, তার রহস্যের শেষ এখনও অনেক দূরে।