
কাঁচকলা (Raw Banana) এমন একটা সবজি, যা নিয়ে বাঙালির ঘরে উপদেশের শেষ নেই। গা হাত-পা ফ্যাকাশে লাগলেই বাড়ির বড়রা ফরমান জারি করতেন, “রোজ পাতে কাঁচকলা সেদ্ধ খা, শরীরে এক ফোঁটাও রক্তের অভাব থাকবে না।” আবার পেট বিগড়ে একাকার হলেও সবার আগে মনে পড়ত কাঁচকলার হালকা ঝোলের কথা। কাটার পর হাত কালো হয়ে যায় বলেই অনেকেই ছোট থেকে ধরে নিয়েছেন, এতে বোধহয় আয়রনের খনি লুকোনো রয়েছে। কিন্তু আসল বিজ্ঞানটা জানলে অনেকেরই চোখ কপালে উঠবে।
কী বলছে গবেষণা?
সবার আগে রক্ত আর আয়রনের হিসেবটা বুঝে নেওয়া দরকার। কাঁচকলা কাটলে যে কালো দাগ হয়, তা কিন্তু আয়রন নয়, স্রেফ উদ্ভিদের প্রাকৃতিক কষ। অনেকে ভাবেন কাঁচকলার আয়রন শরীর নাকি একদমই নিতে পারে না। কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। আমাদের পেটের রস আর ভিটামিন সি-এর গুণে শরীর এই আয়রন নিতে পারে ঠিকই, কিন্তু ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। আন্তর্জাতিক পুষ্টি তথ্য ঘেঁটে দেখা গিয়েছে, প্রতি একশো গ্রাম কাঁচকলায় আয়রন থাকে বড়জোর ০.৩ থেকে ০.৫ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ রক্ত বাড়ানোর মাপকাঠিতে এই পরিমাণটা একেবারেই যৎসামান্য। রোজ কাঁচকলা খেয়ে হিমোগ্লোবিন বাড়িয়ে ফেলার ধারণাটা আসলে একটা বড়সড় ভুল বিশ্বাস।
তবে পেট খারাপের বেলায় কাঁচকলার ক্ষমতা কিন্তু একশো ভাগ খাঁটি। পেট খারাপ হলে কাঁচকলা সেদ্ধ খাওয়ানো কোনও গালগল্প নয়। আন্তর্জাতিক ডায়রিয়া গবেষণা কেন্দ্রের (icddr,b) একদল গবেষক হাসপাতালে ডায়রিয়ায় ভোগা শিশুদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, সাধারণ ওষুধের সঙ্গে কাঁচকলা খাওয়ালে বাচ্চারা অনেক দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। কাঁচকলায় এমন এক জটিল শর্করা থাকে যা পেটে চট করে গলে না। সোজা কোলনে গিয়ে অন্ত্রের অতিরিক্ত জল টেনে নেয় এবং মলের সমস্যার সমাধান করে।
তাহলে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বেলায় কাঁচকলা ছুঁতেও বারণ করা হয় কেন? থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তের এমন এক রোগ, যেখানে রক্তকণিকা খুব দ্রুত ভেঙে যায় এবং শরীরে উল্টে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন জমতে শুরু করে। আর বেশি আয়রন জমে গেলে রোগীর হার্ট বা লিভার নষ্ট হয়ে যাওয়ার মারাত্মক ভয় থাকে। সমাজে প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে কাঁচকলা মানেই আয়রনের আড়ত। সেই ভয় থেকেই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের খাদ্যতালিকা থেকে এটিকে বাদ রাখা হয়। কাঁচকলায় বাস্তবে আয়রন খুব বেশি না থাকলেও, কোনওরকম ঝুঁকি না নেওয়ার জন্যই চিকিৎসকেরা বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এটি থেকে রোগীকে দূরে রাখতে বলেন। সোজা হিসেব, পেট ঠান্ডা রাখতে আর ডায়রিয়া রুখতে কাঁচকলা ধন্বন্তরি। তবে শরীরে রক্ত বাড়াতে কাঁচকলার ওপর চোখ বুজে ভরসা করার দিন কিন্তু শেষ।