
রাতের আকাশে চাঁদকে দেখে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু মহাকাশের নিয়মে সেই চাঁদই ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এখনই অবশ্য এর প্রভাব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। তবে কোটি কোটি বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে পৃথিবীর দিন-রাত, জোয়ার-ভাটা, সূর্যগ্রহণ এমনকি জলবায়ুতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব বর্তমানে প্রায় ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। প্রতি বছর চাঁদ আরও প্রায় ৩.৭৮ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ পৃথিবীর মহাসাগরে তৈরি হওয়া জোয়ার-ভাটা এবং তার সঙ্গে যুক্ত ঘর্ষণ। এই ঘর্ষণ পৃথিবীর ঘূর্ণনকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে যে শক্তি ক্ষয় হয়, তার একটি অংশ চাঁদের কক্ষপথে যুক্ত হয়। ফলে চাঁদ আরও দূরের কক্ষপথে সরে যায়।
বাড়বে দিনের সময়
চাঁদের এই দূরে সরে যাওয়ার সঙ্গে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হওয়ার ফলে দিন সামান্য করে দীর্ঘ হচ্ছে। বর্তমান হিসাবে প্রতি ১০০ বছরে দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৮ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে।
কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর সঙ্গে আজকের পৃথিবীর তুলনা করলেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রায় ১৮০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর এক দিন ছিল আনুমানিক ১৮ ঘণ্টার। ভবিষ্যতে এই পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকলে প্রায় ১০০ কোটি বছর পর একটি দিন প্রায় ২৭ ঘণ্টা দীর্ঘ হতে পারে। একই সময়ে চাঁদ পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ শতাংশ দূরে সরে যেতে পারে।
জোয়ার-ভাটা কী হবে?
চাঁদ দূরে সরে গেলে তার মহাকর্ষীয় প্রভাবও কমবে। ফলে পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার চরিত্র বদলে যেতে পারে। অনুমান অনুযায়ী, চাঁদের দূরত্ব যদি প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে জোয়ারের উচ্চতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমতে পারে।
এর প্রভাব শুধু সমুদ্রের পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপকূলীয় পরিবেশ, সামুদ্রিক প্রাণী এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তুতন্ত্রকেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
হারিয়ে যেতে পারে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ
চাঁদের দূরত্ব বাড়ার আরও একটি উল্লেখযোগ্য ফল হতে পারে সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে। বর্তমানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিতে পারে বলেই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।
কিন্তু চাঁদ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকলে আকাশে তার আপাত আকারও ছোট হতে থাকবে। প্রায় ৬০ কোটি বছর পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যখন চাঁদ আর সূর্যের সম্পূর্ণ চাকতি ঢেকে রাখতে পারবে না। তখন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পরিবর্তে পৃথিবী থেকে মূলত বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যেতে পারে।
বদলে যেতে পারে পৃথিবীর জলবায়ু
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের স্থিতিশীলতা নিয়ে। বর্তমানে চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর অক্ষের হেলনকে অনেকটাই স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। চাঁদ অনেক দূরে চলে গেলে সেই স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীর অক্ষের হেলন উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হলে ঋতুচক্র ও জলবায়ুতেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে পৃথিবীর পরিবেশ আজকের পরিচিত অবস্থার তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যেতে পারে।
প্রায় ১০০ কোটি বছর পর আরও বড় বিপদ
চাঁদের দূরে সরে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সূর্যের বিবর্তনও পৃথিবীর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে। বিজ্ঞানীদের মডেল অনুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি বছর পর সূর্যের উজ্জ্বলতা বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে জলবায়ু ব্যবস্থায় ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং দীর্ঘ সময়ে মহাসাগরের জলও হারিয়ে যেতে পারে।
সমুদ্রের জল না থাকলে জোয়ার-ভাটাজনিত ঘর্ষণ অনেকটাই কমে যাবে। ফলে চাঁদের দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়তে পারে এবং পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে স্থির হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
শেষ পরিণতি আরও ভয়াবহ
এরও কয়েকশো কোটি বছর পর সূর্য তার জীবনের শেষ পর্যায়ের দিকে এগোতে গিয়ে বিশাল আকার ধারণ করবে। তখন পৃথিবী ও চাঁদের অস্তিত্বই চরম বিপদের মুখে পড়বে। সূর্যের প্রচণ্ড তাপ পৃথিবীর পৃষ্ঠকে বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য করে তুলতে পারে। এমনকি শেষ পর্যন্ত পৃথিবী ও চাঁদ সূর্যের বাইরের স্তরের মধ্যে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অবশ্য এই সব পরিবর্তন এত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ঘটবে যে বর্তমান মানবসভ্যতার জীবদ্দশায় এর কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ, চাঁদ ধীরে ধীরে দূরে সরে গেলেও আজ বা আগামী কয়েক প্রজন্মের পৃথিবীতে তার জন্য কোনও বড় পরিবর্তন অপেক্ষা করছে না।