
ছুটির সন্ধ্যা, রেস্তোরাঁ, আর সামনে ধোঁয়া ওঠা শিক কাবাব! এমন লোভনীয় আয়োজনের সঙ্গে রুমালি রুটি না থাকলে ভোজনরসিকদের মন ঠিক ভরে না। উইকেন্ড এলেই পকেট থেকে বেশ কড়কড়ে কয়েকটা নোট খসিয়ে এই শাহী পদের স্বাদ নেন অনেকেই। রেস্টুরেন্ট ছাড়া বাইরের দোকানেও এই রুটির কদর হাত রুটির চেয়ে বেশি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, সাধের এই পদটির জন্ম ঠিক কীভাবে?
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন কিছু তথ্য সামনে আসে, যা হজম করা রীতিমতো কঠিন। আজ যে খাবারটি অনেকের কাছে বিলাসিতা আর আভিজাত্যের প্রতীক, মোঘল যুগে তার কদর শুনলে আপনি আক্ষরিক অর্থেই ভিরমি খাবেন। মোঘল সম্রাট এবং তাঁদের আমির-ওমরাহদের ভোজসভা মানেই ছিল এলাহি ব্যাপার। খাঁটি ঘি, মাখন আর সুগন্ধি মশলায় চপচপে রকমারি পদের ছড়াছড়ি। সোনা-রুপোর থালায় খাবার পরিবেশন হলেও, তখন তো আর কাঁটা-চামচের চল ছিল না, হাত দিয়ে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। আর এখানেই লুকিয়ে আছে আসল টুইস্ট!
খেতে গিয়ে রাজপুরুষদের হাতে যে রাশি রাশি তেল-ঘি লাগত, তা পরিষ্কার করার জন্য কোনও সাধারণ তোয়ালে বা জলের পাত্র আসত না। থালার পাশে সুন্দর করে ভাঁজ করা থাকত রুমালি রুটির (Rumali Roti)। অত্যন্ত পাতলা ও নরম হওয়ার কারণে, হাতের সব তেল-মশলা নিমেষে শুষে নিত এই রুটি। আর খাওয়া শেষে হাত মোছার পর সেই ব্যবহৃত রুমালি রুটি স্রেফ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হত! অর্থাৎ, আজকের মহার্ঘ্য এই পদটি মোঘলদের কাছে ছিল নিছকই ‘টিস্যু পেপার’! রুমালের মত ব্যবহার করা হত বলেই এর নাম হয় রুমালি রুটি।
বিষয়টি কিন্তু মোটেও গালগল্প নয়। গবেষক সালমা হোসেনের লেখা বিখ্যাত বই ‘দ্য এম্পেররস টেবিল: দ্য আর্ট অফ মোঘল কুইজিন’-এ মোঘল দরবারের এই অদ্ভুত অভ্যাসের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অনেকের মতে, এর অন্য একটি ইতিহাসও রয়েছে। বৌদ্ধ যুগে প্রচলিত ‘মণ্ডক’ নামের একটি পদই কালের নিয়মে বদলে গিয়েছে, আর তা থেকেই আজকের এই রূপ। পঞ্জাবে আবার একে বিশাল চেহারার জন্য বলা হয় ‘লম্বু রুটি’।
কড়াই উল্টো করে তার পিঠে শূন্যে ভাসিয়ে হাতের জাদুতে সেঁকে নেওয়া এই খাবারটির ইতিহাস সত্যিই বড় অদ্ভুত। যে জিনিস একসময় রাজাদের হাত মুছে ফেলে দেওয়ার কাজে লাগত, আজ সেটাই আমজনতার কাছে অন্যতম সেরা ডিশের সঙ্গী। কালচক্রের কী অদ্ভুত পরিহাস, তাই না?