
স্মার্টফোনের অ্যালার্মের (Smartphone Alarm) কর্কশ শব্দে ঘুম ভাঙা অনেকেরই রোজকার অভ্যাস। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ঘুম ভাঙার এই হঠাৎ ধাক্কা শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গেই হৃৎপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়তে শুরু করে।
গভীর ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্কের পুরোপুরি সজাগ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ বলে। অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি (RMIT) বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, হঠাৎ তীব্র কর্কশ অ্যালার্ম বাজলে মানুষের শরীর সরাসরি আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যায় এবং সতর্ক হয়ে ওঠে। এতে মস্তিষ্কে এক ধরনের আকস্মিক ধাক্কা তৈরি হয়, যা স্নায়ুকে অত্যন্ত উত্তেজিত করে তোলে।
হঠাৎ ঘুম ভাঙার এই পরিস্থিতিতে শরীরে কর্টিসল এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ দ্রুত বাড়তে থাকে। এই হরমোনগুলোর প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং শরীরের রক্তনালিগুলো সরু হয়ে আসে। ফলে হৃৎপিণ্ডকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পাম্প করতে হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, সকালের দিকে মানবদেহে স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকে, যাকে ‘মর্নিং সার্জ’ বলা হয়। কার্ডিওলজিস্টদের মতে, ঠিক এই শারীরিক পরিবর্তনের কারণেই সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেন স্ট্রোকের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এই সংবেদনশীল সময়ে অ্যালার্মের কর্কশ আওয়াজ শরীরের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
অ্যালার্ম বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমচোখে মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রাখলে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। সকাল সকাল সোশাল মিডিয়ার উদ্বেগজনক খবর কিংবা অফিসের কাজের ইমেল দেখলে শরীর সরাসরি ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে চলে যায়। দীর্ঘ দিন ধরে এমন অভ্যাস চলতে থাকলে রক্তচাপের সমস্যা চিরস্থায়ী রূপ নিতে পারে।
কর্কশ বা তীব্র বিপ্-বিপ্ আওয়াজের অ্যালার্ম হৃদযন্ত্রের ওপর যতটা মানসিক আঘাত ফেলে, সুরেলা শব্দ ততটা করে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাঁশি, পিয়ানো বা ধীর লয়ের কোনও সুর অ্যালার্ম হিসেবে বাছলে ঘুম ভাঙে অনেক শান্তভাবে। এতে স্লিপ ইনার্শিয়ার ধাক্কা কমে এবং শরীর স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার উপযুক্ত সময় পায়।
হার্ট সুস্থ রাখতে ঘুম থেকে ওঠার অন্তত আধ ঘণ্টা পর্যন্ত মোবাইল ফোন একদম স্পর্শ করবেন না। ঘুম ভাঙার পর বিছানা ছেড়ে উঠে কয়েক মিনিট খোলা বাতাসে স্বাভাবিক আলোয় শান্তভাবে বসুন। সকালে উঠে আগে এক গ্লাস জল খেয়ে শরীরকে আর্দ্র করুন এবং নিজেকে ধীরে ধীরে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত হতে দিন।
সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান হল শোওয়ার ঘরে মোবাইলের বদলে কাঁটা দেওয়া সাধারণ টেবিল ঘড়ি ব্যবহার করা। এছাড়া অ্যালার্ম এমন মৃদু সুরে সেট করুন যা আচমকা বুক ধড়ফড় না করিয়ে আলতো করে আপনাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবে। সুস্থ থাকতে ঘুম ভাঙার সময়ে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সময় দেওয়া ভীষণ জরুরি।