
আজকাল বাসি খাবার গরম করা থেকে শুরু করে চটজলদি রান্না, অনেকের বাড়িতেই মাইক্রোওয়েভ ওভেন নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু জানেন কি, এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রান্নাঘরের যন্ত্রটির আবিষ্কারের পিছনে রয়েছে একেবারে অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা? একটি চকোলেট বার গলে যাওয়াই বদলে দিয়েছিল রান্নার দুনিয়া! Getty Images

গল্পটা ১৯৪৫ সালের। আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ার পার্সি স্পেনসার তখন রেথিয়নে কাজ করছিলেন এবং রাডারের জন্য ব্যবহৃত ম্যাগনেট্রন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। একদিন একটি সক্রিয় ম্যাগনেট্রনের কাছে কাজ করার সময় হঠাৎ তাঁর পকেটে থাকা একটি চকোলেট বার গলে যায়। শরীর গরম না থাকা সত্ত্বেও চকোলেট কেন গলল, তা নিয়ে স্পেনসারের কৌতূহল জাগে। Getty Images

ঘটনাটিকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে না দিয়ে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন স্পেনসার। প্রথমে তিনি ম্যাগনেট্রনের কাছে কিছু ভুট্টার দানা রাখলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দানাগুলি ফুটে তৈরি হয়ে গেল পপকর্ন! এতে তাঁর ধারণা আরও জোরালো হল যে ম্যাগনেট্রন থেকে নির্গত মাইক্রোওয়েভ খাবারকে দ্রুত গরম করতে পারে। Getty Images

এরপর আরও পরীক্ষা করতে গিয়ে স্পেনসার ডিম নিয়েও পরীক্ষা করেন। মাইক্রোওয়েভের তাপে ডিমের ভিতরে চাপ তৈরি হয়ে সেটি ফেটে যায়। একের পর এক পরীক্ষার পর তিনি বুঝতে পারলেন, এই তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করে খাবার রান্না বা গরম করা সম্ভব। এখান থেকেই জন্ম নিতে শুরু করল মাইক্রোওয়েভ ওভেন তৈরির ধারণা। Getty Images

এরপর রেথিয়নের সঙ্গে কাজ করে স্পেনসার মাইক্রোওয়েভে খাবার রান্নার প্রযুক্তি আরও উন্নত করেন। ১৯৪৫ সালের ৮ অক্টোবর এই প্রযুক্তির জন্য পেটেন্ট আবেদন করা হয়। পরে ১৯৪৭ সালে 'Radarange' নামে প্রথম বাণিজ্যিক মাইক্রোওয়েভ বাজারে আসে। তবে আজকের ছোট্ট ওভেনের সঙ্গে তার চেহারার কোনও মিল ছিল না, প্রায় ৬ ফুট লম্বা, ৭৫০ পাউন্ড বা প্রায় ৩৪০ কেজি ওজনের সেই যন্ত্র ছিল বিশালাকার। দামও ছিল প্রায় ৫,০০০ ডলার। Getty Images

এত বড় আকার আর বিপুল দামের কারণে প্রথম দিকে সাধারণ বাড়িতে মাইক্রোওয়েভের ব্যবহার খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি। প্রথম দিকের Radarange মূলত রেস্তরাঁ ও বাণিজ্যিক জায়গায় ব্যবহৃত হত। পরে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রের আকার ছোট হতে থাকে এবং দামও কমে আসে। ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে তুলনামূলক ছোট countertop মডেল বাজারে আসার পর ঘরোয়া ব্যবহারের পথ আরও সহজ হয়। Getty Images

আজ মাইক্রোওয়েভ শুধু খাবার গরম করার যন্ত্র নয়, রান্না ও বেকিংয়ের নানা কাজেও ব্যবহার করা হয়। আর এই প্রযুক্তির পিছনে থাকা পার্সি স্পেনসারের সেই অদ্ভুত আবিষ্কারের গল্প আজও বিজ্ঞান ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় 'accidental discovery' হিসেবে পরিচিত। তাঁর জীবদ্দশায় ১৫০-রও বেশি পেটেন্ট ছিল এবং ১৯৯৯ সালে তাঁকে 'National Inventors Hall of Fame'-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। Getty Images

ভাবুন তো, কাজ করতে গিয়ে পকেটের একটা চকোলেট বার গলে না গেলে হয়তো স্পেনসার এই অদ্ভুত ঘটনাটিকে গুরুত্বই দিতেন না! কিন্তু সেই ছোট্ট ঘটনাই তাঁকে পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল রান্নার দুনিয়া। তাই এবার থেকে মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করার সময় মনে রাখবেন, এর পিছনে রয়েছে একটি গলে যাওয়া চকোলেট বারের অবাক করা গল্প! Getty Images