
গরম ভাতে প্রথম পাতে শুক্তো না পড়লে বাঙালির ঠিক মন ভরে না, বিয়েবাড়ি হোক বা ঘরোয়া অনুষ্ঠান, এই পদটি ছাড়া ভোজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যুগের পর যুগ ধরে এই স্বাস্থ্যকর তেতো পদটি আমাদের রসনায় এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছে, যার স্বাদ এককথায় অনবদ্য। এই পদটির সঙ্গে বাঙালির একটা অদ্ভুত আবেগ জড়িয়ে রয়েছে যা ভাষায় প্রকাশ করা বেশ কঠিন।
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, পর্তুগিজরা নাকি প্রথম করলা দিয়ে এক ধরনের তেতো পদ তৈরি করত। সেই পর্তুগিজ পদটির সঙ্গেই নাকি আজকের এই শুক্তোর বেশ মিল রয়েছে, যা কালের নিয়মে বাঙালির হেঁশেলে আরও সুস্বাদু এক পদে বদলে গিয়েছে। আগেকার দিনে মূলত খাওয়ার রুচি বাড়াতেই এই পদের চল শুরু হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী তেতো খাবার দিয়ে খাওয়া শুরু করলে তা হজমে দারুণ সাহায্য করে। খাওয়ার আগে মুখশুদ্ধি হিসেবেই প্রাচীনকাল থেকে এই পদের চল শুরু হয়েছিল, কারণ পেট ঠান্ডা রাখতে ও রুচি বাড়াতে এর কোনও তুলনা নেই। স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখেও বাঙালির পাতে এই পদের এত কদর দেখা যায়।
এই পদে উচ্ছে, কাঁচকলা, সজনে ডাঁটা, রাঙা আলু ও বড়ির মতো নানা দেশীয় সবজির ব্যবহার হয়ে থাকে। সবজির নানা স্বাদের সঙ্গে দুধের অদ্ভুত মেলবন্ধনই হল শুক্তোর মূল বৈশিষ্ট্য, যা একে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। রাঁধুনি বা পাঁচফোড়নের ফোড়ন ছাড়া এই পদের আসল স্বাদ কখনও খোলে না।
রাঁধুনির বিশেষ গন্ধ আর হালকা তেতো-মিষ্টি স্বাদই এই পদকে বাকি সব খাবারের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তোলে। বাঙালিদের অত্যন্ত প্রিয় হলেও বিদেশিদের কাছে এই পদের স্বাদ একেবারেই নতুন ধরনের, তাই তাদের এই পদ খাওয়াতে গেলে অনেকেই এর ইংরেজি নাম খুঁজতে শুরু করেন। অবাঙালিদের কাছে এই খাবারের মহিমা বোঝাতে গিয়ে অনেকেই বেশ বিপাকে পড়েন।
কখনও ভেবে দেখেছেন এই প্রিয় পদটির আক্ষরিক ইংরেজি নাম কী হতে পারে? ডিকশনারিতে এর নির্দিষ্ট কোনও এক শব্দের ইংরেজি নাম নেই, কারণ এটি সম্পূর্ণ বাঙালি পদ। যেহেতু পশ্চিমি দুনিয়ায় ঠিক এই ধরনের রান্নার কোনও চল নেই, তাই এর কোনও সরাসরি বিকল্প শব্দও তৈরি হয়নি। যেমন পিৎজা বা পাস্তার কোনও বাংলা হয় না, ঠিক তেমনই শুক্তোরও নিজস্ব কোনও ইংরেজি প্রতিশব্দ হয় না।
বিদেশিদের কাছে পদটি বোঝানোর সুবিধার্থে মূলত 'মিক্সড-ভেজিটেবল স্টু' (Mixed-vegetable stew) কথাটি ব্যবহার করা হয়। যেহেতু নানা রকম দেশীয় সবজি একসঙ্গে সেদ্ধ করে হালকা ঝোল রাখা হয়, তাই 'স্টু' শব্দটি এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই। আরও একটু নিখুঁতভাবে বোঝাতে অনেকেই একে 'বেঙ্গলি বিটার মিক্সড-ভেজিটেবল স্টু' বলে থাকেন। 'বিটার-সুইট ভেজিটেবল মেডলি' (Bitter-sweet vegetable medley) ও বলেন অনেকে।
বিদেশি ভাষায় এর উপাদানগুলি বোঝাতে ড্রামস্টিকস বা বিটার গোর্ডের মতো শব্দ ব্যবহার করা হলেও, মূল পদটিকে স্টু হিসেবেই বর্ণনা করা হয়। তাই এবার থেকে অবাঙালি বা বিদেশি বন্ধুদের এই পদ খাওয়াতে গেলে সহজেই 'মিক্সড-ভেজিটেবল স্টু' বলে বিষয়টা তাদের বুঝিয়ে বলতে পারবেন। তবে ইংরেজি নাম যাই হোক না কেন, বাঙালির কাছে শুক্তো হল এক প্লেট নিখাদ ভালোবাসা।